বিএনপি সরকার এখনও জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করছেন না অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ-২০২৫’। ফলে এই অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাতে বসেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের এমন সিদ্ধান্ত রাজস্ব খাতের মতো ‘অরাজনৈতিক’ সংস্কারেও পিছু হঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অথচ দেশের অর্থনীতির জন্য এই সংস্কার ছিল অপরিহার্য।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১২ মে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত সংস্কারের অংশ হিসেবে এই অধ্যাদেশ জারি করেছিল। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পুনর্গঠন করে দুটি বিভাগে ভাগ করা হয়। প্রথমটি হলো রাজস্ব নীতি বিভাগ, যা করনীতি তৈরি, আইন সংশোধন, আন্তর্জাতিক চুক্তি ও গবেষণার দায়িত্বে থাকবে। এর অর্থ, করহার নির্ধারণের দায়িত্ব এবার এই বিভাগ করবে। অন্যটি হলো রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ, যা মূলত কর আদায় করবে।
ব্যবসায়ীরা বহু বছর ধরে এই সংস্কার চেয়েছিলেন। অর্থনীতিবিদরাও একই পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, “কোনো সরকারই আগে রাজস্ব খাতে এত বিস্তৃত সংস্কার করেনি। অন্তর্বর্তী সরকারই প্রথমবার তা করেছিল। আগে নীতি প্রণয়ন এবং কর আদায়ের দায়িত্ব একই জায়গায় থাকত, যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করত।” তবে বিএনপি সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর গঠিত সংসদের বিশেষ কমিটি অধ্যাদেশটি এখনই বিল আকারে না তোলার সুপারিশ করেছে। ১০ এপ্রিলের মধ্যে সংসদে না তুললে এটি কার্যকারিতা হারাবে।
অন্তর্বর্তী সরকার মাত্র ১৮ মাসে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। এর মধ্যে চারটি বাতিল ও ১৬টি এখনই সংসদে বিল আকারে না তোলার সুপারিশ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত একটি, সচিবালয় সংক্রান্ত দুটি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত তিনটি, গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত দুটি এবং দুদক সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ।
রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অধ্যাদেশ নিয়ে সরকারের ভিন্নমত থাকতে পারে। কিন্তু লক্ষ্য করা যাচ্ছে, রাজস্ব খাতের মতো ‘অরাজনৈতিক’ সংস্কারেও সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এর প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক ঋণ ও মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে সম্পর্কেও। উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আইএমএফের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি (সর্বশেষ ৫৫০ কোটি ডলার) ডিসেম্বরে পাওয়া যায়নি। আগামী জুনে দুই কিস্তিতে ১৩০ কোটি ডলার পাওয়ার কথা। নতুন সরকার আরও ২০০ কোটি ডলার ঋণ চাওয়ার পরিকল্পনা করছে।
মজিদ আরও বলেন, বর্তমান সরকার অধ্যাদেশটি পর্যালোচনা করছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাজস্ব খাতের এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার অব্যাহত থাকবে।
বিশ্লেষকরা মনে করাচ্ছেন, যখন বাজেট তৈরি হয়, তখন নানা খাতে করহার ঠিক করা হয়। এতে অতিরিক্ত আয়ের দিকে নজর দেওয়া হয়, যা সীমিত আয়ের মানুষ ও ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ তৈরি করে। বারবার করহার পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তায় ফেলে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
রাজস্ব খাত সংস্কার:
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দেশের কর হার নির্ধারণ ও রাজস্ব আদায়ের মূল সংস্থা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, যার প্রায় ৮৮ শতাংশ আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এনবিআরকে।
সরকার যখন বাজেট প্রণয়ন করে, তখন বিভিন্ন খাতে করহার ঠিক করা হয়। অভিযোগ আছে, এই প্রক্রিয়ায় মূল বিবেচনা থাকে বাড়তি রাজস্ব আদায়। এতে সীমিত আয়ের মানুষ ও ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। বারবার করহার পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তায় ফেলে।
অর্থনীতিবিদরা বলেন, একটি দেশের শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, নতুন খাতের বিকাশ ও দ্রব্যমূল্য নির্ভর করে করনীতির ওপর। করনীতি হওয়া উচিত এ বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে, শুধু রাজস্ব বাড়ানো বা সহজে কর আদায়ের চিন্তা থেকে নয়। দীর্ঘদিন ধরে এই পরামর্শ ছিল, করনীতির প্রণয়ন ও কর আদায়ের দায়িত্ব দুটি আলাদা সংস্থাকে দেওয়া হোক।
আইএমএফের শর্তের চাপে অবশেষে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী ২০২৫ সালের ১২ মে ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। এতে এনবিআরকে বিলুপ্ত করে দুইটি বিভাগ তৈরি করা হয়—রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ। তবে অধ্যাদেশ কার্যকর হতেই এনবিআরের বড় অংশ আন্দোলনে নামে। তাঁদের যুক্তি ছিল, নতুন কাঠামো অনুযায়ী রাজস্ব নীতি ও আদায়ে কম অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পদায়নের সুযোগ বাড়বে। শুল্ক ও কর ক্যাডারের কর্মকর্তারা বঞ্চিত হবেন।
দেড় মাস ধরে চলা আন্দোলনের কারণে রাজস্ব আদায় কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। পরে ব্যবসায়ীদের মধ্যস্থতায় আন্দোলন থেকে সরে আসে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। একযোগে অন্তর্বর্তী সরকার তৎকালীন উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের নেতৃত্বে একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়।
ফাওজুল কবির খান নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করা হয়। এতে বলা হয়েছে, সরকার সামষ্টিক অর্থনীতি, বাণিজ্যনীতি, পরিকল্পনা, রাজস্ব নীতি বা রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে রাজস্ব নীতি বিভাগের সচিব পদে নিয়োগ দেবে। ফলে শুল্ক ও কর ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদায়নের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
বর্তমান সরকারের অধ্যাদেশ সংসদে না তোলার বিষয়ে এনবিআরের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে অস্পষ্টতা রয়েছে। সংস্থার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নতুন সরকার রাজস্ব খাতে সংস্কার করতে চায়, তবে আইন করে নয়। তারা অধ্যাদেশটি পর্যালোচনা করে নতুন করে বিল আকারে সংসদে উপস্থাপন করতে চায়।
যদি অধ্যাদেশটি সংসদে আইনে পরিণত করা হতো, তাহলে নতুন সরকারের সামনে ঝামেলা সৃষ্টি হতো। সংশোধনের প্রক্রিয়ায় আমলাদের চাপ ও এনবিআরের আন্দোলনের মুখোমুখি হতে হতে পারে। এছাড়া আইএমএফেরও প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠক আগামী ১৩ থেকে ১৮ এপ্রিল ওয়াশিংটন, যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হবে। এতে অংশ নেবে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নেতৃত্বাধীন ১৪ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে সরকার আরও ২০০ কোটি ডলার ঋণ চাইতে পারে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বৈঠকে দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হবে। চলমান ঋণ কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তি ছাড় এবং আইএমএফের শর্ত কিছুটা নমনীয় করার বিষয়েও আলোচনা হবে।
সম্পূর্ণরূপে গ্রহণযোগ্য নয়:
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করেছিল, যা ব্যাংক একীভূত করার সুযোগ তৈরি করেছিল। তা সংশোধিত আকারে সংসদে তোলার সুপারিশ করেছে বিশেষ কমিটি। ১ এপ্রিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আজিমুদ্দিন বিশ্বাসের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয় অধ্যাদেশটি আইন আকারে উপস্থাপনের জন্য কিন্তু রাজস্ব খাতের অধ্যাদেশ নিয়ে এ ধরনের কোনও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে গঠিত গবেষণা সংস্থা বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) এর চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান বলেন, “রাজস্ব নীতি তৈরি ও আদায়ের কাজ দুটি আলাদা সংস্থার মাধ্যমে করার পরামর্শ আমরা বহু বছর ধরে দিয়ে আসছি। দুটি কাজ একই সংস্থার হাতে থাকলে স্বার্থের সংঘাত, পক্ষপাত এবং নানা সমস্যা সৃষ্টি হয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জন্য এটি অপরিহার্য। এই সংস্কার থেকে সরে যাওয়া একদমই উচিত হবে না।”

