দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) কাঁচামালের অভাবে বন্ধ হওয়ার পথে। প্রতিষ্ঠার ৫৭ বছরের ইতিহাসে এমন ঘটনা প্রথমবার ঘটতে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে গত ৩৫ দিনে অপরিশোধিত তেলের কোনো জাহাজ না আসায় কারখানার মজুত মাত্র ২০ হাজার টনে সীমাবদ্ধ। উৎপাদন কমানো হলেও এই পরিশোধনাগারটি ১০ এপ্রিলের মধ্যে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। চলতি মাসে নতুন কোনো চালান চট্টগ্রাম বন্দরে আসার সম্ভাবনা নেই। যেটি আসছে, সেটি মে মাসের শুরুতে পৌঁছাবে এবং লাইটার জাহাজের মাধ্যমে কারখানায় আনতে অন্তত পাঁচ দিন লাগবে। এই হিসেব অনুযায়ী ইআরএল অন্তত ২৫ দিন বন্ধ রাখতে হবে। তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) আশ্বস্ত করেছে যে, দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হবে না। তারা বিকল্প উৎস থেকে মজুত বাড়াচ্ছে।
৫৭ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার:
১৯৬৮ সাল থেকে চট্টগ্রামের ইআরএল দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রতি দুই বছর পর ৪৫ দিনের জন্য এর পর্যায়ক্রমিক রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। তবে ৫৭ বছরে কখনো মজুত শেষ হয়ে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। ইআরএল মাসে প্রায় দেড় লাখ টন তেল পরিশোধন করে, যার মধ্যে ৬০ হাজার টন ডিজেল, ১৫ হাজার টন পেট্রোল, এবং ন্যাফথা, ফার্নেস অয়েল, বিটুমিনসহ ১৪ ধরনের জ্বালানি উৎপন্ন হয়।
দেশে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা, যার মাত্র ৮ শতাংশ আসে স্থানীয় উৎস থেকে। ইআরএল বছরে ১৫ লাখ টন জ্বালানি পরিশোধন করে, যা মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ।
উৎপাদন কমেছে:
প্রতিমাসে দেশের জন্য অপরিশোধিত তেলের দুইটি চালান আসে, কমপক্ষে দুই লাখ টন করে। এটি সাধারণত প্রতিদিন ৪,৫০০ টন জ্বালানি উৎপাদন করে। কাঁচামাল কমে যাওয়ায় গত সপ্তাহে দৈনিক উৎপাদন কমে হয়েছে ৩,৭০০ টনে, বর্তমানে further কমে ৩,২০০ টনে। বর্তমানে মজুত থাকা ২০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল ১০ এপ্রিলের মধ্যে শেষ হবে। যুদ্ধের কারণে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে মার্চে দুই লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসেনি। তবে স্থানীয় উৎপাদন ও আমদানির মাধ্যমে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল সরবরাহ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
বিকল্প উদ্যোগ:
সরকার সৌদি আরব থেকে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল আমদানি করছে। জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানান, ইআরএল সাময়িক বন্ধ হলেও অকটেন ও পেট্রোলের সরবরাহে সমস্যা হবে না। দেশে তিন মাসের পর্যাপ্ত অকটেন মজুত আছে এবং চলতি মাসে ডিজেলেরও সংকট নেই।
মে ও জুনের জন্য ৩,৫০,০০০ টন জ্বালানি তেল আমদানি প্রক্রিয়াধীন, যার বেশি ভাগ ডিজেল। বাংলাদেশে মাসিক ডিজেলের সর্বোচ্চ চাহিদা ৩,৭০,০০০ টন, যার ৬০,০০০ টন আসে ইআরএল থেকে। এপ্রিলের জন্য প্রায় ১,১০,০০০ টন ডিজেল ইতিমধ্যেই আমদানির নিশ্চয়তা রয়েছে।
পেট্রোল ও অকটেন পরিস্থিতি:
দেশের পরিশোধনাগার পেট্রোলের চাহিদা পূরণ করে এবং অকটেনের চাহিদার ৪০ শতাংশ। কনডেনসেট উৎপাদন অব্যাহত থাকায় পেট্রোলের সংকট নেই। মাসিক ৩৫,০০০ টন অকটেন চাহিদার জন্য ইতিমধ্যেই জাহাজে সরবরাহ এসেছে। তবে ইআরএলের বন্ধ হওয়ায় ন্যাফথা সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। এটি পেট্রোল ও অকটেন মিশ্রণে ব্যবহৃত হয়।
বিপিসির পুরনো তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে দেশে ডিজেল মজুত প্রায় ১,২৭,৮১০ টন, যা ১০ দিনের চাহিদা মেটাবে। অকটেন ও পেট্রোল যথেষ্ট। ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েলের মজুত পুরো এপ্রিলের জন্য পর্যাপ্ত।
সৌদি আরবের ইয়ানবু থেকে ২০ এপ্রিল এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল জাহাজে লোড হবে। আরেকটি জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে আটকা, যা মে মাসের শুরুতে আসার সম্ভাবনা। দুই জাহাজ মিলিয়ে দুই লাখ টন তেল চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে পারে।
বিপিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক জানিয়েছেন, জাহাজ আসার পরও লাইটার জাহাজে তেল আনতে সময় লাগবে। ১২টি লাইটার ব্যবহার করে আনতে হবে, এবং পণ্যের মান নিশ্চিত করতে ৮–১০ ঘণ্টা সময় নেওয়া হবে।
ইআরএলের উৎপাদন ও সরবরাহ:
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইআরএল ৭,৩২,২৩০ টন ডিজেল, ৩,৮৬,৮২৯ টন ফার্নেস অয়েল, ৫৯,১৫০ টন পেট্রোল, ৫৬,৯৩৪ টন কেরোসিন, ৫৭,৪১৪ টন বিটুমিন, ১৬,১৮৭ টন এলপিজি, ৮,০৭১ টন জেবিও ও ১,৫৩,৫২৯ টন ন্যাফতা বিপিসিকে সরবরাহ করেছে।
পরিবহন খাতেই জ্বালানির চাহিদা সবচেয়ে বেশি; বিক্রিত তেলের ৬৩.৪১ শতাংশ ব্যবহৃত হয়েছে। ডিজেল বিক্রি হয়েছে ৪৩,৫০,০৭৫ টন, যা মোট বিক্রির ৬৩.৬৪ শতাংশ।

