দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের চিত্র আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এ খাতে যে বিপুল অঙ্কের বকেয়া জমেছে, তা জাতীয় সংসদে তুলে ধরে পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্ট করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সংসদে দেওয়া তথ্যমতে, গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এটি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আজ সোমবার (৬ এপ্রিল) ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবুল হাসনাতের লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এই তথ্য জানান। একই সঙ্গে তিনি শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপি প্রতিষ্ঠান ও তাদের বকেয়া ঋণের তথ্যও প্রকাশ করেন।
প্রকাশিত তালিকায় রয়েছে—
এস. আলম সুপার এডিবল অয়েল লিমিটেড, এস. আলম ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড, সালাম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, এস. আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেড, সোনালী ট্রেডার্স, বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড, গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন লিমিটেড, কেমন ইস্পাত লিমিটেড, এস. আলম ট্রেডিং কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড, ইনফিনিট সিআর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, কেয়া কসমেটিকস লিমিটেড, দেশবন্ধু সুগার মিলস লিমিটেড, পাওয়ার প্যাক মুতিারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড, পাওয়ার প্যাক মুতিারা জামালপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড, প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড, কর্ণফুলী ফুডস (প্রা.) লিমিটেড, মুরাদ এন্টারপ্রাইজ, সিএলসি পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড, বেক্সিমকো কমিউনিকেশন্স লিমিটেড এবং রংধনু বিল্ডার্স (প্রা.) লিমিটেড।
খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকার একাধিক কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও সংসদকে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, যেসব ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, তাদের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা দলের সঙ্গে নিয়মিত ত্রৈমাসিক বৈঠক করা হচ্ছে। এসব বৈঠকে ঋণ আদায়ের প্রতিবন্ধকতা শনাক্ত করে সমাধানে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে আয়োজিত ব্যাংকার্স সভাগুলোতেও প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপি ঋণ আদায়ের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকগুলোর জন্য আলাদা ঋণ পুনরুদ্ধার কৌশল নির্ধারণে গাইডলাইন প্রণয়ন করা হয়েছে।
ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের চিহ্নিত করতে ২০২৪ সালের ১২ মার্চ জারি করা বিআরপিডি সার্কুলার-০৬ অনুযায়ী নীতিমালা কার্যকর রয়েছে। এছাড়া ব্যাংকের আইন বিভাগ শক্তিশালী করতে বিআরপিডি সার্কুলার-১৪/২০২৪ অনুযায়ী নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রতিটি ব্যাংককে তাদের মোট খেলাপি ঋণের অন্তত ১ শতাংশ নগদ আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা হয়েছে বিআরপিডি সার্কুলার-১১/২০২৪ এর মাধ্যমে।
ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড আইএফআরএস–৯ (আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মানদণ্ড–৯) অনুযায়ী প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতি ভিত্তিক ঋণ শ্রেণিকরণ ও সংরক্ষণ নীতিমালা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। জামানতের সঠিক মূল্য নির্ধারণ নিশ্চিত করতে তালিকাভুক্ত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মূল্যায়নের ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে।
এছাড়া খেলাপি ঋণ সংকট মোকাবিলায় আরও কিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও জানান অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে—প্রাসঙ্গিক আইনসমূহ সংশোধনের উদ্যোগ, স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ পুনঃতফসিল নীতিমালার হালনাগাদ, খেলাপি ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ, নিয়মিত ঋণগ্রহীতাদের প্রণোদনা দেওয়া, একজন গ্রাহকের ঋণ গ্রহণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, অর্থ ঋণ আদালতের কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে বিচারক প্যানেলে অভিজ্ঞ ব্যাংকার যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে খেলাপিরা যাতে আইনি প্রক্রিয়া ব্যবহার করে ঋণ আদায় বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সে বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পাশাপাশি বেসরকারি খাতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠনের লক্ষ্যে আইন প্রণয়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত খুলতে পারে।

