দেশে বাড়তে থাকা জ্বালানি আমদানি ব্যয় ও বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যে বিদ্যুৎচালিত যানবাহনের (ইভি) ব্যবহার বাড়াতে শুল্ক কমানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। বিশেষ করে বাস, ট্রাকসহ ভারী বাণিজ্যিক যানবাহনে এই সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে, যা শিল্প ও পরিবহন খাতে ব্যয় কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
জ্বালানি নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ওপর বিদ্যমান উচ্চ শুল্ক কমানোর সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মার্চের শুরুতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে পাঠানো এক প্রস্তাবে বলা হয়েছে—ইভির ওপর আরোপিত কর এমনভাবে পুনর্নির্ধারণ করতে হবে, যাতে তা প্রচলিত জ্বালানিচালিত যানবাহনের তুলনায় কম হয়।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমবে এবং আমদানিকৃত তেল-গ্যাসের ওপর চাপও কিছুটা হ্রাস পাবে। বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বগতি এবং মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে সরবরাহ অনিশ্চয়তা ব্যবসা খাতে চাপ বাড়িয়েছে। উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতিও বাড়ছে—এমন প্রেক্ষাপটে বিকল্প হিসেবে ইভির ব্যবহারকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, বর্তমান কর কাঠামো ইভি ব্যবহারে উৎসাহ দেয় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ওপর করের হার জ্বালানিচালিত গাড়ির চেয়েও বেশি, যা নীতিগতভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, একটি সাধারণ ডিজেল বা পেট্রলচালিত বাস আমদানিতে যেখানে প্রায় ৪০ শতাংশ কর দিতে হয়, সেখানে বৈদ্যুতিক বাসে তা ৯০ শতাংশের বেশি। একইভাবে ট্রাকের ক্ষেত্রেও ইভির ওপর করের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।ডাম্পার, টিপার বা এক্সকাভেটরের মতো ভারী যন্ত্রপাতিতেও একই চিত্র দেখা যায়। ফলে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদে খরচ কম হলেও প্রাথমিক বিনিয়োগের চাপের কারণে ইভির দিকে ঝুঁকতে পারছেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ডিজেলচালিত ট্রাক প্রতি ১০০ কিলোমিটারে ২৫ থেকে ৪০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি খরচ করে। জ্বালানির দামের ওঠানামার কারণে পরিবহন খাতে ব্যয় বাড়ছে। বিপরীতে বৈদ্যুতিক ট্রাক ব্যবহারে এই খরচ ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি এখনও পর্যালোচনাধীন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে এতে পরিবর্তন আসতে পারে। খসড়া “ইলেকট্রিক ভেহিকল ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট পলিসি ২০২৫”-এ ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারি ও কর্পোরেট যানবাহনের অন্তত ৩০ শতাংশ ইভিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে আমদানি শুল্ক কমানো, নিবন্ধন ফি হ্রাস এবং করছাড়ের মতো নানা সুবিধার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ক্রেতাদের জন্য ব্যাংক ঋণের সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে ইভিতে বিনিয়োগ সহজ হয়।
বিশ্বজুড়ে ইভির ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও বাংলাদেশে এর বিস্তার ধীরগতির। সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৫ অর্থবছরে দেশে ২০০টিরও কম ইভি আমদানি হয়েছে, আর চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে এই সংখ্যা আরও কম। এদিকে বৈদ্যুতিক বাস কেনার পরিকল্পনাও এখনও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা শুল্ক কমানোর প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও শুধু আমদানির ওপর নির্ভর না করে দেশে উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাদের মতে, যন্ত্রাংশ আমদানিতে কর কমিয়ে স্থানীয় সংযোজন ও উৎপাদন উৎসাহিত করা গেলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং শিল্প খাত শক্তিশালী হবে। ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে দেশে ইভি উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও অবকাঠামোগত সহায়তা না থাকলে এই খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

