বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাবে বাংলাদেশে গ্যাস সরবরাহ ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠেছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি দ্বিগুণ দামে হলেও চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। ফলে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্ধেক ক্ষমতা অপ্রয়োজনীয়ভাবে অলস বসিয়ে রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম থাকায় লোডশেডিং বাড়ছে।
এলএনজি আমদানির চ্যালেঞ্জ:
দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশে এলএনজি আসে মূলত কাতার ও ওমান থেকে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই দুই দেশ থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, চলতি পরিস্থিতিতে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত এলএনজি সরবরাহ বন্ধ থাকতে পারে। যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, এই সময়সীমা আরও বাড়তে পারে।
দেশের বর্তমান গ্যাস উৎপাদন মাত্রা দিনের ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশি গ্যাসক্ষেত্র থেকে ১৭০ কোটি এবং এলএনজি থেকে ৯৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ হয়। দৈনিক চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। ঘাটতি পূরণের জন্য এক খাত থেকে গ্যাস কমিয়ে অন্য খাতে সরবরাহ বাড়ানো হয়। বর্তমানে সার কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, এলএনজি থেকে দিনে সর্বোচ্চ ১১০ কোটি ঘনফুট সরবরাহের সুযোগ আছে। এপ্রিল মাসে ১১টি জাহাজ আনার মধ্যে ইতোমধ্যেই ৯টি কার্গো এসেছে। খোলাবাজার থেকে ৮টি এবং কাতারের সঙ্গে চুক্তির অধীনে অ্যাঙ্গোলা থেকে একটি কার্গো আসবে। এর ফলে দিনে গড়ে ৯৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, শিল্প ও কৃষি উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয়, সেভাবেই জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হলেও শিল্পে সরবরাহ কমানো যাবে না। এছাড়া কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করা হলে এবং জ্বালানিসাশ্রয়ী নির্দেশনা মানা হলে লোডশেডিং কমানো সম্ভব।
এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকি ও দামের চাপ:
এপ্রিল মাসে দুটি জাহাজ দেশে পৌঁছেছে। বাকি সাতটি জাহাজ ১০, ১১, ১৫, ১৮, ২১, ২৪ ও ২৭ এপ্রিলের মধ্যে আসবে। এছাড়া মে মাসে ১১টি কার্গো আনার পরিকল্পনা আছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ১০ ডলার ছিল। এপ্রিল মাসে দাম বেড়ে গড়ে ২০ ডলারের বেশি হয়েছে, সর্বোচ্চ ২৮.২৮ ডলার।
চলতি অর্থবছরে গ্যাস খাতে ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রথম ৯ মাসে পেট্রোবাংলা ৪,৫০০ কোটি টাকা ভর্তুকি নিয়েছে। শুধুমাত্র এপ্রিলেই ৪,৫০০ কোটি টাকা দাবি করছে। অর্থাৎ বরাদ্দের বাইরে ৩,০০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত খরচ হয়েছে। আগামী দুই মাসে আরও ৯,০০০ কোটি টাকার ভর্তুকি লাগার সম্ভাবনা আছে। এছাড়া এলএনজি আমদানি করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও বাড়ছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেছেন, “দাম বেশি হলেও সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী এলএনজি কেনা হচ্ছে। এতে গ্যাস সরবরাহ ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে। আগামী মাসে সরবরাহ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।”
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, গ্রীষ্ম মৌসুমে লোডশেডিংমুক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে দিনে ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। গতকাল সরবরাহ হয়েছে মাত্র ৯১ কোটি ঘনফুট। ফলে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতার অর্ধেক অপ্রয়োজনীয়ভাবে অলস বসে আছে। এই কেন্দ্রগুলোকে নিয়মিত ভাড়া দিতে হয়।
কোয়ার অভাবে দুটি কেন্দ্র চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। তেলচালিত কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন বাড়ালে ভর্তুকি বাড়তে থাকে। সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা এখন ১৫,০০০ মেগাওয়াট, যা বেড়ে ১৮,৫০০ মেগাওয়াটে পৌঁছানোর সম্ভাবনা আছে। ফলে লোডশেডিং কমাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো এবং চাহিদা নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ।
ভূতত্ত্ববিদ বদরুল ইমাম বলেন, “জ্বালানি ছাড়া দেশ চলতে পারে না। স্বল্পমেয়াদে এলএনজি কেনা প্রয়োজন, তবে দেশীয় জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল সমাধান।”

