দেশে গত এক দশকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের বিস্তার ঘটেছে। সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি সেই প্রবৃদ্ধির একটি সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে। নতুন পরিসংখ্যান বলছে, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সেবা ও উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই বেড়েছে কার্যক্রমের পরিধি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা এখন ১ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৭৯২। ২০১৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৬৫। অর্থাৎ ১০ বছরে নতুন যুক্ত হয়েছে ৩৮ লাখ ৮৪ হাজার ২২৭টি ইউনিট। শতাংশ হিসেবে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪৯.৬৫।
শুধু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাই নয়, বেড়েছে কর্মসংস্থানও। বর্তমানে এসব ইউনিটে কাজ করছেন ৩ কোটি ৬ লাখ ৩২ হাজার ৬৬১ জন। ২০১৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪৫ লাখ ৮৫০। এক দশকে কর্মসংস্থান বেড়েছে ২৫.০৩ শতাংশ। কর্মীদের মধ্যে পুরুষের অংশ ৮৩.২৮ শতাংশ, নারীর অংশ ১৬.৭১ শতাংশ এবং তৃতীয় লিঙ্গের অংশগ্রহণ ০.০১ শতাংশ। এই তথ্য অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্তির একটি ইঙ্গিত দেয়।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভৌগোলিক বিস্তারেও রয়েছে বৈচিত্র্য। মোট ইউনিটের মধ্যে সর্বোচ্চ ২৭.০৮ শতাংশ ঢাকা বিভাগে। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে ১৭.৫১ শতাংশ এবং রাজশাহী বিভাগে ১৪.৩৬ শতাংশ। খুলনায় ১২.৭৩ শতাংশ, রংপুরে ১১.৪১ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৬.৬৩ শতাংশ এবং বরিশালে ৫.৬১ শতাংশ ইউনিট রয়েছে। সবচেয়ে কম ইউনিট সিলেট বিভাগে, মাত্র ৪.৬৭ শতাংশ।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের অর্থনীতি এখন মূলত সেবা খাতনির্ভর। মোট ইউনিটের ৯০.০২ শতাংশই সেবা খাতের অন্তর্ভুক্ত, যার সংখ্যা ১ কোটি ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪৩। অন্যদিকে শিল্প খাতের ইউনিট মাত্র ৯.৯৮ শতাংশ। ব্যবসার ধরনে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা এবং মোটরযান মেরামত খাত সবচেয়ে বড়, যার অংশ ৪১.৮২ শতাংশ।
শিল্প কাঠামোর দিকে তাকালে স্পষ্ট হয় ক্ষুদ্র উদ্যোগের আধিপত্য। মোট ইউনিটের মধ্যে মাইক্রো শিল্প ৫৬.৬৭ শতাংশ এবং কুটির শিল্প ৩৮.৭৪ শতাংশ। ক্ষুদ্র শিল্প রয়েছে ৪.২০ শতাংশ, মাঝারি শিল্প ০.৩১ শতাংশ এবং বৃহৎ শিল্প মাত্র ০.০৮ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের শিল্পভিত্তি এখনও মূলত ক্ষুদ্র ও কুটির পর্যায়েই সীমাবদ্ধ।
মালিকানার ধরনেও একই প্রবণতা। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই ব্যক্তিগত বা পারিবারিক মালিকানাধীন, যার হার ৮৭.৩৬ শতাংশ। প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি ১.৮২ শতাংশ এবং অংশীদারিত্বভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ১.৪৪ শতাংশ।
শহর ও গ্রামের তুলনায় দেখা যায়, পল্লী এলাকায় অর্থনৈতিক ইউনিট বেশি। গ্রামে রয়েছে ৭৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮২৮টি ইউনিট, শহরে ৪৩ লাখ ১৬ হাজার ৯৬৪টি। দুই ক্ষেত্রেই গত দশকে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী ৫৩.৫৭ শতাংশ স্থায়ী, ৪.৯১ শতাংশ অস্থায়ী এবং ৪১.৫২ শতাংশ খানা-ভিত্তিক। সব মিলিয়ে শুমারির এই চিত্র বলছে, দেশের অর্থনীতি গত এক দশকে শক্তিশালীভাবে বিস্তৃত হয়েছে। তবে এর বড় অংশ এখনও সেবা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তানির্ভর।

