দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) এখন একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। কর্পোরেট অর্ডার প্রায় বন্ধ, পাইকারি ক্রয়াদেশও আগের মতো নেই। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তাহমিনা আক্তার শাম্মী জানালেন, “রোজার ঈদের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো পাইকারি কাস্টমার পাইনি। অথচ এ সময়ে অনেক ক্রেতা থাকার কথা। কিন্তু সব ধরনের বিক্রি একেবারে কমে গেছে।”
প্রতিবেশী খাতের সমস্যা অপ্রত্যাশিত নয়। প্লাস্টিকের খেলনা প্রস্তুতকারী এসএমই উদ্যোক্তা আমান উল্লাহ বলেন, “আমরা সবসময় অ্যাক্সেসরিজ ও র-মেটেরিয়ালস থার্ড পার্টি থেকে সংগ্রহ করি। কিন্তু যুদ্ধ ও তেল সংকটের কারণে মালের দাম এখন দ্বিগুণ। ফলে ছোট ব্যবসায়ীরা ভীষণভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।”
দেশের প্রায় সব ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব দেশের এসএমই খাতেও পড়েছে। এক মাস ধরে বিদেশি ক্রয়াদেশ কমেছে, রপ্তানি আয়েও প্রভাব পড়েছে। জ্বালানি সংকট উৎপাদন ব্যাহত করছে। সরকারি সিদ্ধান্তে রাতে দোকানপাট বন্ধ রাখার ফলে অভ্যন্তরীণ বিক্রিও কমছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে ও বিক্রি কমে যাওয়ায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা হিমশিম খাচ্ছেন।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, “বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এসএমই খাত ধীরগতিতে চলছে। উৎপাদন, বিপণন ও রপ্তানি সব ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়েছে। জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি, সময়মতো পণ্য সরবরাহে বাধা ও ই-কমার্স ডেলিভারিতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। বিদেশি অর্ডার কমে যাওয়া উদ্বেগজনক।”
এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১ কোটি ১৮ লাখ এসএমই উদ্যোক্তা রয়েছেন। এই খাতে প্রায় ৩ কোটি ৭ লাখ মানুষ সরাসরি নিয়োজিত। জাতীয় অর্থনীতিতে খাতটির অবদান প্রায় ২৮ শতাংশ। আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, “এত বড় কর্মসংস্থান সৃষ্টির খাত গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। যুদ্ধের কারণে খাতটি টিকে থাকার লড়াই করছে।”
অর্গানিক কসমেটিক্স প্রতিষ্ঠান ‘রিবানা’র বর্ষসেরা উদ্যোক্তা মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, “যুদ্ধের কারণে প্যাকেজিং, পলিথিন ও প্রিন্টিংসহ সব খরচ বেড়েছে। প্রতি সপ্তাহেই দাম বাড়ছে। এতে ছোট ব্যবসায়ীরা চাপের মধ্যে পড়ছে।” আন্তর্জাতিক অর্ডারও আগের মতো আসছে না। হোম ডেকর ও হস্তশিল্প পণ্যের প্রতিষ্ঠান আহ্লাদ ফ্যাশনসের কর্ণধার জুয়েনা ফেরদৌস বলেন, “রপ্তানি অর্ডার কমেছে। দেশীয় বাজার ছোট হওয়ায় শুধু স্থানীয় বাজার দিয়ে টিকে থাকা কঠিন। অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা ছোট করতে বাধ্য হচ্ছেন।”
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের প্রতিষ্ঠান অর্লিনস লেদারস অ্যান্ড ফুটওয়্যারের এমডি তাহমিনা আক্তার শাম্মী বলেন, “হাজারীবাগ ও লেক সিটির শোরুম- দুই জায়গাতেই একই অবস্থা। সন্ধ্যা ৭টার পরে দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা আর্থিক চাপে পড়েছি। ভাড়া, বেতন, ফ্যাক্টরি খরচ সবকিছু চালানো কঠিন।”
এসএমই ফাউন্ডেশনের এমডি জানান, বৈশাখী মেলা ৭টা পর্যন্ত হলেও সমস্যা নেই। “প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বরাতে জানা গেছে, রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত মেলা চালানো সম্ভব। আগামী ১২ এপ্রিল শুরু হতে যাওয়া মেলা সাতদিন চলবে। উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ অপ্রয়োজনীয়।”
জাতীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সমিতির সভাপতি মির্জা নূরুল গণী শোভন বলেন, “বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ পরিস্থিতি ও তেল সংকট খাতকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হলে ছোট ও মাঝারি শিল্প প্রথমেই বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। কাঁচামাল আমদানি বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে, যা উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী খাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।”
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, “রাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি ও কাঁচামাল সংকটের সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাব মিলিয়ে এসএমই খাত বহুমাত্রিক চাপে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, সাপ্লাই চেইন বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবে কাজ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। উৎপাদন, গ্রাহক সংখ্যা ও মুনাফা কমছে, কর্মসংস্থান প্রায় থমকে গেছে। স্থানীয় বাজারের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস খাতের টিকে থাকার লড়াই কঠিন করেছে। এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগজনক।”

