ইরানে চলমান যুদ্ধে বিশ্বের মতো বাংলাদেশও জ্বালানি সংকটে পড়েছে। অনেকে জানাচ্ছেন, কিছু জ্বালানি পণ্য আনতে হচ্ছে দ্বিগুণ দামেও। দেশজুড়ে ৯৫ শতাংশের বেশি জ্বালানি সম্পূর্ণ আমদানি নির্ভর। তবে এপ্রিল মাসের জন্য সরকার তেলের দাম বাড়ায়নি। এই পরিস্থিতিতে সরকারের ওপর আরও ভর্তুকি চাপ পড়েছে।
সরকার আশা করছে যুদ্ধ শীঘ্রই শেষ হবে। তবে যুদ্ধ শেষ হলেও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার শান্ত হতে সময় লাগবে। ইরান যুদ্ধের আগে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি ছিল সহনীয় পর্যায়ে। অন্যদিকে, যুদ্ধে সরাসরি জড়িত দেশগুলোও সংকটে পড়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি দাম বাড়ছে, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। এতে বাংলাদেশের মতো আমদানিকারক দেশের জন্য রপ্তানি ও জ্বালানি সরবরাহ আরও সংকুচিত হচ্ছে।
দেশের শিল্প খাতেও প্রভাব পড়ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এপ্রিলের শুরু থেকেই লোডশেডিং বেড়েছে এবং মে মাস পর্যন্ত গরম বাড়ার কারণে বিদ্যুতের চাহিদিও বাড়বে। এই চাপ শিল্প খাতে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে দেশে উৎপাদিত শিল্পজাত পণ্যের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমেছে। বিশেষ করে শিল্প খাতে হ্রাস বেশি দেখা গেছে। নির্বাচিত সরকারের আশাবাদ ছিল যে, নতুন নীতি শিল্প খাতে উৎসাহ বাড়াবে। তবে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উদ্যোক্তাদের গ্যাস বা ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
গ্যাস ও ডিজেল উভয় খাতেই সরবরাহ সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ইতিমধ্যে গ্যাসের ঘাটতি ছিল, যা যুদ্ধের প্রভাবে তীব্র হতে পারে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরবরাহ ক্রমেই কমছে। ফলে এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। সরকারকে যে দামেই হোক এবং যেখান থেকে সম্ভব, তা এনে পরিস্থিতি সামলাতে হচ্ছে। গ্যাসের অভাবে সার কারখানা চালু রাখা কঠিন। নতুন খবর হলো, চাহিদা অনুযায়ী সার আমদানিতেও অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে। তবে চলমান বোরো মৌসুমে সার সংকটের আশঙ্কা নেই। তবুও অনেক কৃষক ডিজেল সংগ্রহে সমস্যা করছেন। সময়মতো সেচ না দিলে ফসলের ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে।
সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ব্যবহারের জন্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর লক্ষ্য সরকারি ব্যয়ের চাপ কমানো এবং অগ্রাধিকার অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। বেসরকারি খাতে এলপিজির দাম বাড়ানো হয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় রান্নাঘরে এর চাহিদা বেড়েছে। তবে প্রশ্ন হলো, নির্ধারিত দামেও এলপিজি কি পাওয়া যাবে কিনা। দেশের প্রতিটি জ্বালানি পণ্যের ওপর আমদানির নির্ভরতা ঝুঁকিমুক্ত নয়।
ইরান যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি আমাদের কতটা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, তা ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে ‘আপৎকালীন মজুত’ নেই, অর্থাৎ আমদানিতে কোনো সমস্যা হলে কিছুদিনের জন্যও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেখায়, কিছু দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকে সফল হয়েছে। বাংলাদেশ এখনও প্রায় পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভর। যুদ্ধ দ্রুত না থামলে এই পরিস্থিতি দেশের জন্য অসহনীয় ভোগান্তির কারণ হতে পারে।
যদিও সরকার এপ্রিলের জন্য জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি, তবু ভোক্তাদের কাছে তেল পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সংকট দৃশ্যমান। তেল সংগ্রহে দীর্ঘ সময় লাগায় চাপ পড়ছে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে। বাস ভাড়া এখনও বৃদ্ধি পায়নি, তবে পণ্য পরিবহনের ব্যয় ইতিমধ্যেই বেড়েছে। এর প্রভাব বাজারে পড়তে শুরু করেছে।
মার্চে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসার খবর থাকলেও এপ্রিলে তা আবার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। স্থল ও নৌবন্দর থেকে পণ্য পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে প্রভাব পড়বে শুধু বাজারে নয়, রপ্তানিমুখী শিল্পেও। ইতিমধ্যেই কয়েক মাস ধরে আমাদের রপ্তানি আয় নিম্নমুখী। প্রবাসী আয় কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও মার্চে ইতিহাসের সর্বোচ্চ আয় এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত বাংলাদেশিদের ওপর যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবের প্রতিফলনও হতে পারে। অনেকে বিপদ অনুমান করে সঞ্চিত অর্থ পাঠাচ্ছেন। এতে রিজার্ভ শক্তিশালী হলেও জনশক্তি রপ্তানি খাতের ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।
অর্থমন্ত্রী ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছেন, ভর্তুকির চাপ সামলাতে সামনে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে হতে পারে। সরকারের রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি ক্রমে খারাপ হচ্ছে। এই কারণে উন্নয়ন ব্যয় সীমিত করা হচ্ছে, যদিও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা চলছে। নতুন জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারের এ ক্ষেত্রে মনোযোগ আরও বাড়ার আশা রয়েছে।
অপ্রত্যাশিত সংকটকালে সরকারকে অগত্যা উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে পরিস্থিতি সামলাতে হতে পারে। তবে এতে সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসা ও কর্মসংস্থান কমতে পারে। বিশেষ করে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি। শহরাঞ্চল ও মহাসড়কের ধারে সরকারি সংস্থাগুলো অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে। কিন্তু জ্বালানি সংকটে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন-যাত্রার সময় এই ধরনের অভিযান কতটা কার্যকর বা প্রাসঙ্গিক, তা পুনর্বিবেচনা করা দরকার। সব রকম সংস্কারেরই সময়-অসময় রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর নীতি-প্রভাব, জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর ওপর। দ্রুত জ্বালানিনির্ভর হয়ে ওঠা অর্থনীতি পরিবহন ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে। একদিকে জ্বালানি সংকট, অন্যদিকে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি—এই মিলিত প্রভাব প্রায় সব খাতকে সংকটে ফেলছে।
এ পরিস্থিতিতে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিতে হবে খাদ্যশস্য উৎপাদনে। শস্য উৎপাদন ভালো থাকায় বাজারে এখন পর্যন্ত আলু, পেঁয়াজ ও ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে চাহিদামতো ডিজেল ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে চালসহ খাদ্য উৎপাদন এবং পরিবহন স্বাভাবিক রাখতে হবে। কারণ আমদানিনির্ভর খাদ্যপণ্যের দাম আমরা সেভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। জ্বালানির মতো এ সরবরাহও অনিশ্চিত। এর মধ্যে খাতুনগঞ্জ থেকে ভোজ্যতেলের দামের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির বাস্তবতাও অস্বীকার্য নয়। ফলে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা বিপুলভাবে আমদানির ওপর নির্ভর।
সরকারকে এই সংকটকালে সুচিন্তিত নীতি ও দৃঢ় কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। প্রশাসনকে জনকল্যাণে সম্পৃক্ত করতে যথেষ্ট উদ্যোগী হতে হবে। অপচয়মূলক ব্যয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে অন্যান্য খাতকে সাশ্রয়ী হতে হবে। জ্বালানি তেলের সংকট সামলানোর প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ সংকটও প্রকট হয়েছে। তাই বিদ্যুৎ আমদানির বিঘ্ন যেন না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে হবে। ভারতের সঙ্গে চলমান ডিজেল আমদানিও গুরুত্বপূর্ণ। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরে জ্বালানি সহায়তা বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। সংকটকালে সামান্য সাশ্রয় ও সহায়তাই বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

