প্রায় চার দশক ধরে ত্যাগ আর কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রফতানিতে বিশ্বাসযোগ্য দেশের মর্যাদা অর্জন করেছে। গত কয়েক বছরে রফতানির পরিমাণ বেড়েছে, তবে সেই বৃদ্ধির গতি এখন স্পষ্টভাবে ধীর হয়ে এসেছে।
২০২৬ সালের মার্চে রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ শতাংশের বেশি কমেছে। চলতি অর্থবছরের গত নয় মাসে এত বড় ব্যবধানে রফতানি কখনো কমেনি। বিশেষ চ্যালেঞ্জ হলো, এই বছর আট মাস টানা রফতানি পতন লক্ষ্য করা গেছে—দেশের রফতানি ইতিহাসে এটি নজিরবিহীন।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) গত বৃহস্পতিবার হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে জানায়, মার্চে রফতানি মাত্র ৩৪৮ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। গত বছরের মার্চে এটি ছিল ৪২৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রফতানি কমেছে ৭৭ কোটি ডলার, যা প্রায় ৯ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। সাধারণত মাসিক রফতানি থাকে ৪৫০–৫০০ কোটি ডলারের মধ্যে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রফতানি কমার পেছনে মূল কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং শুল্ক বিষয়ক পরিবর্তন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়া, ভারত, চীন ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাজারে কম দামে পণ্য পাঠানো—সব মিলিয়ে বাংলাদেশি রফতানিকে দীর্ঘ আট মাস ধরে চাপের মধ্যে রেখেছে। এর সঙ্গে ঈদুল ফিতরের কারণে প্রায় ১০ দিন কারখানা বন্ধ থাকার প্রভাবও যুক্ত হয়েছে। মার্চে উৎপাদন ও রফতানি কার্যক্রমে এই বন্ধের প্রভাব পড়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় ধরে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে রফতানি আগের বছরের তুলনায় ৪.৮৫ শতাংশ কমেছে। এই সময়ে মোট রফতানি আয় ৩ হাজার ৫৩৯ কোটি ডলারের মতো হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের ৩ হাজার ৭৭২ কোটি ডলারের চেয়ে কিছুটা কম। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, গত বছর জুলাইয়ে অস্বাভাবিকভাবে বেশি রফতানি হয়েছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত কারখানাগুলো রাত-দিন কাজ করে পণ্য জাহাজীকরণে জোর দিয়েছিল। পাশাপাশি ব্র্যান্ড ক্রেতারা শুল্ক এড়াতে আগাম আমদানি করতে আগ্রহী ছিলেন। ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই ওয়াশিংটনের ঘোষণার পর ৭ আগস্ট রাত ১২টা ১ মিনিটে ২০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হওয়ার কারণে জুলাই মাসে রফতানি স্বাভাবিকের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি হয়েছিল।
চলতি অর্থবছরের আগস্ট মাস থেকেই বাংলাদেশের রফতানি কিছুটা ধীর হয়ে আসে। আগস্টে মোট রফতানি আয় কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ। এরপর সেপ্টেম্বরের রফতানিও আগের মাসের মতোই কমেছে, গড়ে ৫ শতাংশ। অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে কমেছে যথাক্রমে ৭ এবং ৬ শতাংশ। ডিসেম্বরে পতনের হার আরও বেড়ে ১৪.২৩ শতাংশে দাঁড়ায়। জানুয়ারিতে রফতানি হ্রাসের গতি সামান্য ধীর হয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বা অর্ধেক শতাংশে এসেছে। ফেব্রুয়ারিতে আবারও রফতানি কমেছে ১২ শতাংশ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, মার্চ মাসে মোট রফতানি আয় কমার চেয়ে তৈরি পোশাক রফতানি কমেছে আরও বেশি। তৈরি পোশাক রফতানি মার্চে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১৯.৩৫ শতাংশ কমে ২৭৮ কোটি ডলারে নেমেছে। গত বছরের মার্চে এই পরিমাণ ছিল ৩৪৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এককভাবে তৈরি পোশাক থেকে রফতানি আয় কমেছে ৬৭ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের নয় মাসে তৈরি পোশাক রফতানি থেকে আয় এসেছে ২ হাজার ৮৫৮ কোটি ডলার, যেখানে গত বছরের একই সময়ের আয় ছিল ৩ হাজার ২৫ কোটি ডলার।
পোশাক খাতের উৎপাদন ও রফতানিকারকরা জানিয়েছেন, মার্চে বড় অংকের রফতানি হ্রাসের একটি কারণ ছিল রোজার ঈদ উপলক্ষে প্রায় ১০ দিনের কারখানা বন্ধ থাকা। সাধারণত বছরের দুই ঈদে পোশাক খাতে লম্বা ছুটি থাকে। তবে আট মাস ধরে চলা রফতানি কমার পেছনের কারণও মার্চের রফতানিতে প্রভাব ফেলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাল্টা শুল্কের প্রভাব সরাসরি এবং চীন, ভিয়েতনাম, ভারতের মতো দেশগুলোর ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাজারে আগ্রাসী রফতানি কার্যক্রম পরোক্ষভাবে রফতানি কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে, যা ভবিষ্যতে উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে। যদিও বর্তমানে উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ায় কোনো তাত্ত্বিক সমস্যা দেখা দেয়নি। তবে এই পরিস্থিতিতে রফতানি খাতে শিগগিরই সুখবরের সম্ভাবনা নেই।
চলতি অর্থবছরের নয় মাসে অন্যান্য বড় পণ্যের রফতানিতেও একই ধারা দেখা গেছে। হোম টেক্সটাইলের রফতানি কমেছে ২১ শতাংশ, ওষুধে ২০ শতাংশ, সবজিতে ৪৫ শতাংশ এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে ৭ শতাংশ। পাট ও পাটজাত পণ্যের রফতানি ১৩ শতাংশ কমেছে। তবে কিছু পণ্যের রফতানি বৃদ্ধি পেয়েছে—হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ ৫ শতাংশ, কাঁকড়া ৩৩ শতাংশ এবং প্লাস্টিক পণ্য ১৬ শতাংশ বেড়েছে।
রফতানি হ্রাসের এ ধারাবাহিকতায় মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ গোদের উপর বিষফোড়া হিসেবে কাজ করেছে। জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়া এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ইউরোপ-আমেরিকার ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়েছে। ফলে বিদেশী ক্রেতারা কম কিনছেন এবং বাংলাদেশের রফতানিও কমছে। খোদ অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী জানিয়েছেন, “আমরা উদ্যোক্তা-রফতানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক সুদে ঋণ দিতে পারছি না, সময়মতো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দিতে পারছি না। তারা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করবেন কীভাবে?” পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা ও শ্রমিক কর্মদক্ষতার বিষয়গুলো নিয়েও সরকার ওয়াকিবহাল রয়েছে।
বিশ্ব পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে ব্যবসায়ী ও রফতানিকারকদের সঙ্গে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের ঘনিষ্ঠ সমন্বয়, ঋণের সুদহার হ্রাস, প্রয়োজনমতো প্রণোদনার ব্যবস্থা, বিনিময় হারের প্রতি নজরদারি এবং ব্যাংক খাতে তারল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে রফতানি বাণিজ্যে চাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব। পাশাপাশি প্রতিযোগী দেশগুলো কীভাবে তাদের রফতানি ধরে রেখেছে, সে বিষয়েও নজর রাখতে হবে।
- মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক। চেয়ারম্যান, ফাইন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেড।

