দেশের অর্থনীতির চার প্রধান খাতের মধ্যে উৎপাদন ও নির্মাণ শিল্পের সম্প্রসারণের গতি হ্রাস পেয়েছে। সর্বশেষ মার্চ মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কৃষি খাতের বৃদ্ধি কমে যাওয়ায় মোট সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। একমাত্র সেবা খাত ব্যতীত বাকি তিনটি খাতই নিম্নগামী ধারা দেখাচ্ছে।
বাংলাদেশ পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) মার্চে ৫৩.৫ পয়েন্টে নেমে এসেছে, যা ফেব্রুয়ারির ৫৫.৭০ পয়েন্টের তুলনায় ২.২ পয়েন্ট কম। জানুয়ারি মাসে সূচক ছিল ৫৩.৯ এবং ডিসেম্বরে ৫৪.২।
পিএমআই প্রস্তুত করে দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ। এই সূচক প্রতি মাসে দেশের প্রধান চারটি খাত—কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা—এর অবস্থার প্রতিবেদন দেয়। সূচকের মান ৫০-এর ওপরে থাকলে সম্প্রসারণ, ৫০-এর নিচে থাকলে সংকোচন বোঝায়।
সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চে পিএমআই কমে যাওয়ায় সম্প্রসারণের গতি শ্লথ হয়েছে। এমসিসিআই জানিয়েছে, রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রভাব ব্যবসায়িক আস্থাকে নাড়া দিয়েছে। যদিও সার্বিকভাবে প্রত্যাশা ইতিবাচক, তবে অধিকাংশ ব্যবসায়ী মনে করছেন, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে আগামী মাসগুলোতে ব্যবসায়িক পরিবেশ ধীরে ধীরে উন্নতি পেতে পারে।
কৃষি খাতের পিএমআই মার্চে ৫১.৬, যা ফেব্রুয়ারির ৬৪.৫ থেকে কমেছে। যদিও গতিমাত্রা কমেছে, খাতটি ধারাবাহিকভাবে সপ্তম মাসে সম্প্রসারণে রয়েছে। উৎপাদন খাত ১৮ মাসের সম্প্রসারণের পর প্রথমবারের মতো সংকোচনে এসেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে সূচক ছিল ৫৩, মার্চে কমে ৫৯.৭। নতুন অর্ডার, রপ্তানি, সমাপ্ত পণ্য, আমদানি ও কর্মসংস্থান হ্রাস পেয়েছে। তবে কারখানা উৎপাদন, ইনপুট ক্রয় ও সরবরাহকারীর ডেলিভারিতে সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে।
নির্মাণ খাতও মার্চে ৫৯.২ সূচকে স্থিতিশীল থাকলেও সংকোচন অব্যাহত। নতুন ব্যবসা ও কার্যক্রম কমেছে, তবে কর্মসংস্থান ও অর্ডার ব্যাকলগ পুনরায় সম্প্রসারণে এসেছে। ইনপুট খরচ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিষেবা খাতের অবস্থা তুলনামূলকভাবে ভালো। মার্চে সূচক বেড়ে ৫৬.৪ হয়েছে, যা ফেব্রুয়ারির ৫৬.৩ থেকে সামান্য বৃদ্ধি। ১৮ মাসের ধারাবাহিক সম্প্রসারণে এই খাত নতুন ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও ইনপুট খরচসহ সব সূচকে ইতিবাচক চিত্র দেখিয়েছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম মাসরুর রিয়াজ জানিয়েছেন, “মার্চ মাসের পিএমআই ইঙ্গিত করছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হচ্ছে। প্রধানত উৎপাদন খাতের মন্দার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, দীর্ঘ ছুটি, মুদ্রাস্ফীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে দুর্বল করেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।”
সার্বিকভাবে, দেশের প্রধান অর্থনৈতিক খাতগুলো মিশ্র পরিস্থিতিতে রয়েছে। রমজান ও ঈদুল ফিতরের মৌসুমি চাহিদা কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেললেও উচ্চ ব্যয় ও অনিশ্চয়তা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে দুর্বল অর্ডার প্রবাহ ও সতর্ক ক্রেতার আচরণ উদ্বেগের কারণ।

