বাংলাদেশ ব্যাংক রপ্তানিকারকদের জন্য কম সুদে অফশোর ডলার ঋণ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। লক্ষ্য একটাই—অর্থায়ন ব্যয় কমানো এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানো। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিগগিরই এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করে বিস্তারিত কাঠামো ঘোষণা করা হবে।
প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থায় রপ্তানিকারকরা ৮ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারবেন। বর্তমানে স্থানীয় মুদ্রায় নেওয়া ঋণের সুদহার যেখানে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ, সেখানে এই নতুন হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ফলে উৎপাদন ও রপ্তানি খরচে স্বস্তি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই ঋণ মূলত চলতি মূলধনের চাহিদা মেটাতে ব্যবহার করা যাবে। যেমন—বিদ্যুৎ বিল, শ্রমিকের মজুরি এবং অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যয়। ঋণ পরিশোধ করতে হবে রপ্তানি আয়ের বৈদেশিক মুদ্রা থেকে। এতে দেশীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর চাপ কমবে। প্রয়োজনে ঋণগ্রহীতা ডলার সোয়াপ করে টাকা নিতে পারবেন, তাতেও অতিরিক্ত সুদ দিতে হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা উদাহরণ দিয়ে বলেন, যদি কোনো রপ্তানিকারকের ১০০ ডলারের অর্ডার থাকে এবং কাঁচামাল আমদানির জন্য ৬০ ডলারের এলসি খোলা হয়, তাহলে বাকি ৪০ ডলার পর্যন্ত অফশোর ঋণ নেওয়া সম্ভব। এই অর্থ দিয়ে তিনি ইউটিলিটি বিল, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য খরচ মেটাতে পারবেন। ঋণ পরিশোধ হবে রপ্তানি আয় থেকেই।
ব্যাংকগুলো গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে এই ঋণ বিতরণ করবে। ঋণের মেয়াদ হবে তিন মাস থেকে এক বছর। এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঋণসীমা বা কঠোর শর্ত আরোপ করা হবে না। ফলে গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংকগুলো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রায় স্বল্পসুদে ঋণের সুযোগ কমে গেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ কর্মসূচির শর্তে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের আকার ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে কমিয়ে ২.২ বিলিয়ন ডলার করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন উদ্যোগটি নেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে রপ্তানিকারকরা চাপের মধ্যে রয়েছেন। নতুন এই ঋণ সুবিধা তাদের তারল্য বাড়াবে এবং বিনিয়োগে উৎসাহ দেবে।
তবে ঝুঁকির বিষয়টিও সামনে এনেছেন তারা। রপ্তানি আয় দেশে না এলে ঋণ আদায় কঠিন হতে পারে। এছাড়া বিনিময় হার ওঠানামা করলে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, রপ্তানি আয় যখন কমছে, তখন এ ধরনের উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে সুদহার ৮ শতাংশের কম হওয়া উচিত বলেও মত দেন তিনি। তার মতে, অন্যান্য তহবিল থেকে ডলারে ঋণের সুদ ৫ শতাংশের কাছাকাছি হওয়ায় অফশোর ঋণের হার ৬ থেকে ৭ শতাংশ হওয়া যৌক্তিক।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, অফশোর ঋণ চালু হলে রপ্তানিকারকরা কম সুদে অর্থায়নের সুযোগ পাবেন। এতে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি নির্ভরতা কমতে পারে। তবে রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন এবং আয় দেশে ফেরত আনা নিশ্চিত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন উপযুক্ত ঋণগ্রহীতা বাছাইয়ে কঠোর যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। আমদানি ব্যয় মেটাতে এই রিজার্ভ সুরক্ষিত রাখা জরুরি।
ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনও এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তার মতে, অফশোর ব্যাংকিং ঋণে বিধিনিষেধ শিথিল করা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। তবে বিনিময় হার বড় ধরনের পরিবর্তন হলে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে এবং সে দায় ঋণগ্রহীতাকেই বহন করতে হবে।

