দেশে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে কমছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে মোট বিদেশি বিনিয়োগ ২০২৪ সালের একই প্রান্তিকের তুলনায় ১৩ কোটি ২ লাখ ৮০ হাজার ডলার বা প্রায় ২৬.৩৫ শতাংশ কমেছে। নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই)ও হ্রাস পেয়েছে ১৮.৪২ শতাংশ।
গত প্রান্তিকে নিট এফডিআই এসেছে ১০ কোটি ৮০ লাখ ডলার, যা ২০২৪ সালের একই সময়ে ছিল ১৩ কোটি ২৮ লাখ ১০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নিট এফডিআই কমেছে ২ কোটি ৪৮ লাখ ১০ হাজার ডলার। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যান্য বিনিয়োগ—যেমন সরাসরি নতুন মূলধন বিনিয়োগ ও মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ—ও আশানুরূপ বৃদ্ধি দেখাচ্ছে না।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “গত বছর বিনিয়োগের জন্য পরিবেশ অনুকূল ছিল না। রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচন ও স্থায়ী সরকারের অনিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দেশের প্রতি আগ্রহ কমিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছিল, তবে তারা বাধার মুখে পড়েছিল।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পুনর্বিনিয়োগকৃত মুনাফা (রিইনভেস্টেড আর্নিংস)ও এক বছরে ৩৫.৩১ শতাংশ কমেছে। অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে এটি দাঁড়িয়েছে ২১ কোটি ৭৪ লাখ ডলারে, যেখানে ২০২৪ সালের একই সময়ে ছিল ৩২ কোটি ৫৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার। পুনর্বিনিয়োগকৃত মুনাফা মূলত বিদেশি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় কার্যক্রম থেকে অর্জিত লাভ, যা দেশে পুনঃবিনিয়োগ করা হয়। যদিও এটি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়, বাস্তব এফডিআই প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে নতুন মূলধন বিনিয়োগের ওপর, যা এখনও দুর্বল।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর বিশেষ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্বিনিয়োগ কমিয়েছে। নির্বাচনের অনিশ্চয়তা এবং নীতিগত জটিলতা, উচ্চ ব্যবসায়িক ব্যয় ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এফডিআই প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে। নতুন উদ্যোগ গ্রহণও ধীরগতিতে চলছে।”
বিশেষজ্ঞরা আরও জানাচ্ছেন, বন্দর ব্যবস্থাপনায় পরিবহন ও লজিস্টিক সুবিধার সীমাবদ্ধতা, কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতার ঘাটতি বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে রেখেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যকারিতা বাড়ানো ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা কঠিন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “দেশে বেসরকারি খাতেও বিনিয়োগ কমেছে। দেশীয় বিনিয়োগকারীরাও নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী নয়, এবং বিদেশিরাও নতুন বিনিয়োগ থেকে বিরত রয়েছেন। নীতিগত সমস্যা সমাধান না হলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন।”
তথ্য অনুযায়ী, সরাসরি নতুন মূলধন বিনিয়োগ, পুনর্বিনিয়োগকৃত মুনাফা ও আন্তপ্রতিষ্ঠানের ঋণ মিলিয়ে মোট বিদেশি বিনিয়োগ ৩৬ কোটি ৩৮ লাখ ২০ হাজার ডলার হয়েছে, যা ২০২৪ সালের একই সময়ে ছিল ৪৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজীকরণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগের ধারাবাহিক বৃদ্ধি সম্ভব নয়।

