বাংলাদেশের কৃষি খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাস। এ সময়ে কৃষক তাদের ফসলের স্বপ্ন বোনা শুরু করেন। মাঠে এখন পাকা বোরো ধানের সোনালি আভা। বোরো ঘরে তোলার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে আউশ, আমন ও পাটের নতুন মৌসুম। একই সময়ে তরমুজ, বাঙ্গি, আনারস, লিচু ও অন্যান্য ফলের বাজারে ঘ্রাণ ছড়াবে। মে মাসের শেষের দিকে আম বাজারে আসবে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুন উদ্দীপনা দেয়।
কিন্তু এই প্রাচুর্যের মাঝেও সংকটের ছায়া। বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের অস্থিরতা দেশের কৃষি খাতকে নাড়িয়ে দিয়েছে। মাঠে ফসল থাকা সত্ত্বেও কৃষকের মুখে হাসি ফিকে। উৎপাদিত পণ্য বাজারে পৌঁছাতে না পারায় গ্রাম-গ্রামান্তরে অনিশ্চয়তা। তেলের অভাবে যানবাহন চলাচলে বাধা, ফলে ফসল পচছে মাঠেই। অনেকে উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে কৃষকের আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে, পাশাপাশি খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর তেল সংকটে কৃষকের কপালে ভাঁজ পড়েছে। ফসলের দর পতনের প্রভাব পড়েছে কৃষক, পোলট্রি খামারি, মৎস্যচাষী ও দুগ্ধ খামারিতে। এরই সঙ্গে প্রকাশ পাচ্ছে দেশের কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা। আলু ছাড়া অন্য পচনশীল পণ্যের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার নেই। সবজি সংরক্ষণের জন্য দেড় শতাধিক মিনি কোল্ডস্টোরেজ থাকলেও তা চাহিদার তুলনায় কম।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যদি এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, আগামী জুন থেকে আগস্টে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে। খাদ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বাজার অস্থিরতা বাড়বে।
মাঠের ফসল বাজারে পৌঁছায় না:
মুন্সীগঞ্জের চরাঞ্চলের কৃষক নাসির উদ্দীন বলেন, “সবজি, ধানসহ বিভিন্ন ফসল সময়মতো বাজারে পৌঁছাচ্ছে না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।” নাসিরের মতো শত শত কৃষক বর্তমান পরিবহন সংকটে তাদের ফসল বাজারে পাঠাতে পারছেন না। বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ– প্রায় সব কৃষিপ্রধান জেলায় একই চিত্র। কোথাও পাকা তরমুজ ক্ষেতেই পড়ে আছে, কোথাও গাছেই টমেটোর পচন ধরেছে।
বরগুনার তরমুজ চাষিরা জানান, প্রতি একর জমিতে দুই থেকে তিন লাখ টাকা খরচ করে তারা ভালো ফলন পেয়েছেন। কিন্তু ডিজেলের অভাবে ট্রাক, পিকআপ ও নৌযান চলাচল বন্ধ বা সীমিত, ফলে ফসল ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে। বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে দামও কমে গেছে।
মাদারবুনিয়া, ভোলা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জেও একই সমস্যা। স্ট্রবেরি, টমেটো, শাকসবজি ও আনারস দ্রুত বাজারজাত করতে না পারায় কৃষককে খরচের তুলনায় কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে বা বিক্রির সুযোগই পাচ্ছেন না। পার্বত্যাঞ্চলে কাপ্তাই হ্রদ কেন্দ্রিক নৌপথে ইঞ্জিনচালিত নৌকা বন্ধ বা সীমিত। ফলে পাহাড়ি কৃষকও সবজি, আনারস ও কলা বাজারে আনতে পারছেন না। সড়কপথেও পিকআপ ও ট্রাক চলাচল সীমিত, ফসল ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে।
পরিবহন ভাড়া ও জ্বালানি সংকট:
জ্বালানি সংকট সরাসরি প্রভাব ফেলেছে পরিবহন ব্যবস্থায়। ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ– সব ধরনের পণ্যবাহী যানবাহনের চলাচল কমে গেছে। চলাচল করা গাড়ির ভাড়া বেড়েছে কয়েকগুণ। বগুড়ার মহাস্থানহাটের ব্যবসায়ীরা জানান, চট্টগ্রাম পর্যন্ত ১০–১২ টন সবজি পৌঁছাতে আগে ২৪–২৫ হাজার টাকা লাগত, এখন ৩৫ হাজার। সিলেট রুটের ভাড়া বেড়ে গেছে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। ঢাকার কারওয়ান বাজার বা শ্যামবাজারে পণ্য পাঠাতে আগে ১৬ হাজার টাকা লাগত, এখন ২৫ হাজার।
চট্টগ্রামের পাহাড়তলী বণিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, সরকার তেলের দাম বাড়ায়নি, তবে তেলের সংকটকে পুঁজি করে পরিবহন ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে।
প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতেও প্রভাব:
ঢাকার বাজারে সরবরাহ কমে মুরগির দাম বেড়েছে। সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৪২০ টাকা কেজি দরে, দেশি মুরগি ৭৫০–৮০০ টাকা, ব্রয়লার প্রায় ২০০ টাকা। খামার থেকে বাজারে মুরগি আনার গাড়ি কম থাকায় সরবরাহে ঘাটতি।
দুগ্ধ খাতেও খামারিরা লস করছেন। প্রতি লিটার দুধ উৎপাদনে খরচ ৪৪–৪৫ টাকা হলেও বাজারে বিক্রি ৫০–৫২ টাকায়। গোখাদ্যের দাম বেড়ে প্রান্তিক খামারিরা খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন। চট্টগ্রামের জেলেরা ডিজেলের অভাবে সাগরে যেতে পারছেন না। মাছের সরবরাহ কমে প্রায় অর্ধেক। বাজারেও প্রভাব পড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, “এটি শুধু উৎপাদনের বিষয় নয়, খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কৃষিপণ্য পরিবহনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন হলে বিকল্প উৎস থেকে আমদানি ও ভর্তুকি দিয়ে কৃষকের সহায়তা দিতে হবে। সার, বীজ, কীটনাশক, মাছ, হাঁস-মুরগি, গবাদি পশুর খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ অব্যাহত রাখতে হবে।”
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জুন–আগস্টে সংকট আরও স্পষ্ট হবে। দ্রুত বাজারজাতকরণের জন্য বিশেষ ট্রেন সার্ভিস চালু ও কৃষিপণ্যবাহী পরিবহনকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ জরুরি।
সরকারও পদক্ষেপ নিয়েছে। কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, “কৃষকের পাশে আছি। বাজারজাতকরণ সহজ করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, “সেচ ব্যবস্থাপনায় কৃষকের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ডিজেল ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ চলছে। কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ নির্বিঘ্ন রাখতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

