মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিতে পারে। তেল ও এলএনজির মূল্য বৃদ্ধির কারণে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধীর হতে পারে, আমদানি–রপ্তানি কমে যেতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ার ফলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে। এছাড়া তৈরি পোশাক ও কৃষি খাতের উৎপাদনেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
সানেমের বিশ্লেষণ: তেলের ৪০%, এলএনজির ৫০% মূল্যবৃদ্ধি:
সানেম গ্লোবাল ট্রেড অ্যানালাইসিস প্রজেক্টের কম্পিউটেবল জেনারেল ইকুইলিব্রিয়াম মডেল ব্যবহার করে সম্ভাব্য পরিস্থিতিগুলো পরীক্ষা করেছে। এতে দেখা গেছে, যদি বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ ও এলএনজির দাম ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মডেলের ফলাফল অনুযায়ী:
- প্রকৃত জিডিপি প্রায় ১.২% হ্রাস পেতে পারে।
- রপ্তানি প্রায় ২% কমে যেতে পারে।
- আমদানি প্রায় ১.৫% হ্রাস পেতে পারে।
দামের এই ধাক্কার প্রভাবে মূল্যস্ফীতি তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাবে। ভোক্তা পর্যায়ে দাম প্রায় ৪% বেড়ে যেতে পারে, ফলে প্রকৃত মজুরি প্রায় ১% হ্রাস পেতে পারে। এটি পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
সরবরাহে নির্ভরশীলতা ও জ্বালানিসংকট:
সানেম আরও বলেছে, হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হলে দেশে তীব্র জ্বালানিসংকট তৈরি হবে। এটি বাংলাদেশে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সরবরাহের ওপর নির্ভরশীলতাকে স্পষ্ট করে। বর্তমানে দেশের ৭২% এলএনজি আমদানি আসে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তিনটি প্রধান চ্যানেলের মাধ্যমে প্রভাব ফেলছে—জ্বালানি, রেমিট্যান্স এবং বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থা।
সানেম মনে করছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকারের পদক্ষেপ মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। একদিকে কৃচ্ছ্রসাধন নীতি ও জ্বালানি রেশনিং ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা এবং সরকারি বার্তার মধ্যে অমিল লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সানেমের সুপারিশ:
১. নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে মনোযোগ বাড়ানো এবং সহজলভ্য বিকল্পগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা।
২. আসন্ন বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামোর জন্য যথাযথ বরাদ্দ রাখা।
৩. করমুক্ত সরঞ্জাম ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পে বাধা কমানো।
৪. স্বল্পমেয়াদে আমদানিভিত্তিক জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা।
৫. দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ‘কৌশলগত জাতীয় মজুত’ তৈরি করা।
৬. জ্বালানি রেশনিং বাস্তবায়ন, শিল্প উৎপাদন শিফট ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সময়সীমা সমন্বয় করা।
সানেমের বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে যে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চলমান অচলাবস্থা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করছে এবং তা মোকাবিলায় কৌশলগত ও তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ জরুরি।

