দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের ফলে দেশের অর্থনীতি এখন সংকটের দ্বারপ্রান্তে—এমন মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, অর্থনীতির পাশাপাশি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
আজ শুক্রবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৩তম দিনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি এসব কথা তুলে ধরেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী বলেন, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে। জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই বর্তমান সরকার দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অতীত ও বর্তমান চিত্র তুলে ধরছে। এ লক্ষ্যে ২০০৫-০৬ অর্থবছর, ২০২৩-২৪ অর্থবছর এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বিভিন্ন সূচকের তুলনামূলক তথ্য উপস্থাপন করা হয়।
তিনি উল্লেখ করেন, গত ১৬ বছরে অর্থনীতির আকার বাড়লেও ভেতরে ভেতরে নানা কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৭৮ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ৪.২২ শতাংশে।
একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৭.১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯.৭৩ শতাংশে পৌঁছায়। শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধি ১০.৬৬ শতাংশ থেকে নেমে ৩.৫১ শতাংশে এবং কৃষি খাতে ৫.৭৭ শতাংশ থেকে কমে ৩.৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকায় অনেক তরুণ কৃষি খাতে যুক্ত হচ্ছেন, যা ছদ্ম বেকারত্ব বাড়াচ্ছে। বর্তমানে মোট কর্মসংস্থানের ৪১ শতাংশ কৃষি খাতে হলেও জাতীয় আয়ে এর অবদান মাত্র ১১.৬ শতাংশ। তিনি বলেন, এটি শ্রমের নিম্ন উৎপাদনশীলতা ও ‘জবলেস গ্রোথ’-এর ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।
সঞ্চয় ও বিনিয়োগেও দুর্বলতা দেখা গেছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জাতীয় সঞ্চয়ের হার ছিল ২৯.৯৪ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে ২৮.৪২ শতাংশে নেমেছে। অন্যদিকে টাকার মান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০০৫-০৬ সালে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ছিল ৬৭.২ টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ১২১ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর ফলে আমদানি ব্যয় ও জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে।
ব্যাংকিং খাতের অবস্থাও উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৮.৩ শতাংশ থেকে কমে ৬.৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বিনিয়োগ স্থবিরতার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। রাজস্ব ফাঁকি ও অপচয়ের কারণে সরকারের আয় বাড়েনি, বরং বাজেট ঘাটতি ২.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪.০৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
অর্থমন্ত্রী অভিযোগ করেন, আগের সরকারের সময়ে নেওয়া বড় প্রকল্পগুলোর অনেকই অতিমূল্যায়িত ছিল এবং যথাযথ যাচাই ছাড়াই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এতে জনগণ প্রত্যাশিত সুফল পায়নি, বরং বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে।
ঋণ ব্যবস্থাপনাকে তিনি “চরম বিশৃঙ্খল” বলে আখ্যা দেন। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে সুদ পরিশোধে ব্যয় ছিল ৮৫ বিলিয়ন টাকা, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেড়ে ১১৪৭ বিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে। অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ায় বেসরকারি খাত, বিশেষ করে এসএমই উদ্যোক্তারা ঋণ পেতে বাধার মুখে পড়ছেন।
বৈদেশিক খাতেও চাপ বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়। রপ্তানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় চলে গেছে। অর্থ পাচার ও হুন্ডির প্রভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রবাসী আয় কিছুটা বেড়েছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।

