আসন্ন জাতীয় বাজেট ঘিরে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আলোচনা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের আর বেশি সময় বাকি নেই। এরই মধ্যে বিভিন্ন মহল থেকে উঠে আসছে ভিন্নধর্মী বিশ্লেষণ ও মতামত।
তবে একটি বিষয়ে প্রায় সবাই একমত—এই বাজেট একটি কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে আসছে। বৈশ্বিক অঙ্গনে ইরানকেন্দ্রিক যুদ্ধ পরিস্থিতি জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে দেশের ভেতরে অর্থনীতির স্থবিরতা, ঋণের চাপ, ভর্তুকির বোঝা এবং সীমিত সম্পদের বিপরীতে বাড়তে থাকা ব্যয় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এমন নাজুক বাস্তবতায় বাজেট প্রণয়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আগামী বাজেট নিয়ে তিনটি মৌলিক দিক বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রথমত, বাজেটের মূল দর্শন। নতুন অর্থবছরের বাজেট কোন লক্ষ্যকে সামনে রেখে তৈরি হচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। কারণ বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ও উন্নয়ন দর্শনের প্রতিফলন। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, এই দর্শন যেন পরিষ্কারভাবে উপস্থাপিত হয়, যাতে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা সম্পর্কে তারা ধারণা পেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, জনজীবনের প্রত্যাশার প্রতিফলন। বর্তমান বাস্তবতায় মানুষ নানামুখী অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে। তাই বাজেটে তাদের প্রয়োজন ও চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য। প্রয়োজনীয় খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং বাস্তবমুখী নির্দেশনার মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পথ তৈরি করতে হবে। এভাবেই সরকারের দায়বদ্ধতা দৃশ্যমান হয়।
তৃতীয়ত, সামষ্টিক অর্থনীতির বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় বাজেটে সুনির্দিষ্ট নীতি ও কার্যকর সম্পদ বরাদ্দ থাকা জরুরি। একই সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—বাজেট কি মানব উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেবে, নাকি কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধির দিকে ঝুঁকবে? দারিদ্র্য কমানো ও বৈষম্য হ্রাসে এটি কতটা সহায়ক হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য।
বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে। এই খাতগুলোতে ব্যয় জাতীয় আয়ের ৩ শতাংশের নিচে সীমাবদ্ধ, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এটি অন্তত ৫ শতাংশে উন্নীত করা। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এই ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে বাজেটে এই খাতগুলোতে দৃশ্যমান পরিবর্তনের দাবি জোরালো হচ্ছে।
বর্তমান বাস্তবতায় বাজেট প্রণয়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্য রক্ষা করা। সীমিত সম্পদের কারণে বাজেট অযৌক্তিকভাবে বড় করা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি অতিরিক্ত রক্ষণশীলতা বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই একটি স্থিতিশীল ও বাস্তবসম্মত আকার নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এই ভারসাম্য আনতে হলে বড় আকারের কিছু প্রকল্প সাময়িকভাবে স্থগিত বা পুনর্বিন্যাস করতে হতে পারে। একই সঙ্গে ‘প্রয়োজনীয়’ ও ‘গুরুত্বপূর্ণ’ খাতগুলোর মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য নির্ধারণ জরুরি। উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি কর কাঠামোর মতো দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারেও গুরুত্ব দিতে হবে।
অর্থনৈতিক স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হলে বাজেটে কিছু সুস্পষ্ট পদক্ষেপের প্রতিফলন জরুরি—এমন প্রত্যাশাই এখন সাধারণ মানুষের। সবচেয়ে বড় চাপে রয়েছে জ্বালানি খাত। সরবরাহে অনিশ্চয়তা ও উচ্চমূল্য জনজীবনকে কঠিন করে তুলেছে। তাই নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালে রাখার বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা চাইছে সবাই।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির চাপ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্থিরতা মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। গত দুটি বাজেটে এ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন না আসায় মানুষের প্রত্যাশা এখন আরও বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি হঠাৎ কমে না এলেও অন্তত নিয়ন্ত্রণে আসার প্রবণতা দেখা গেলে তা মানুষের আস্থা ফেরাতে সহায়ক হবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও অসন্তোষ কম নয়। বরাদ্দের পরিমাণ ও সেবার মান—দুই ক্ষেত্রেই ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। জাতীয় আয়ের ৩ শতাংশেরও কম ব্যয় এই খাতগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকায় তা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে। ফলে অন্তত ৫ শতাংশে উন্নীত করার দাবি জোরালো হচ্ছে, যা বাজেটে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি।
আগামী বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। শুধু মূল্যস্ফীতি বা বাণিজ্যঘাটতি কমানো নয়, উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের শর্ত পূরণ এবং অর্থনীতির গতি বজায় রাখার জন্যও এটি প্রয়োজন। ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে, কেবল রক্ষণশীল মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তাই রাজস্বনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সমন্বিত প্রয়াস জরুরি। পাশাপাশি রপ্তানি বাড়ানো এবং আমদানির বিকল্প উৎস খুঁজে বের করাও সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অপরিহার্য। বৈষম্য কমাতে কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগের প্রসার ঘটানো দরকার। বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের জন্য নতুন কাজের সুযোগ তৈরিতে বাজেটে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি থাকা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি কৃষি খাতের উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় আলাদা গুরুত্ব দেওয়ার দাবি রয়েছে।
তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা অর্থায়ন। একদিকে ঋণ ও সুদ পরিশোধের চাপ, অন্যদিকে ভর্তুকির বোঝা ব্যয়ের দিকটি ইতিমধ্যেই ভারী। আয়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। করব্যবস্থার দুর্বলতা এবং পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রাজস্ব আহরণকে সীমিত করে রেখেছে। প্রত্যক্ষ কর বাড়িয়ে কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত না করলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাক খাতের ধীরগতি, বৈদেশিক বিনিয়োগের ঘাটতি এবং প্রবাসী আয় কমার শঙ্কা বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতিকে আরও চাপে ফেলতে পারে।
সবশেষে, বাজেটের পূর্বাভাস ও পরিকল্পনা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি। প্রতিটি প্রকল্পের জন্য থাকতে হবে সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন কৌশল এবং কার্যকর মূল্যায়ন কাঠামো। বর্তমান সংকটের মধ্যে একটি ফলপ্রসূ বাজেট তৈরি করা কঠিন হলেও, সঠিক পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণের মাধ্যমে তা অর্জন সম্ভব।

