বিভিন্ন খাতে ভর্তুকির বাড়তি চাপ, নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ—এই তিন কারণে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই বড় ব্যয় পরিকল্পনার দিকে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ধারণা, এসব ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজস্ব আয় একই হারে বাড়ানো কঠিন হবে। ফলে আগামী বাজেটে বড় ধরনের ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কিছু সাশ্রয়ী পদক্ষেপও রাখা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই আজ শুক্রবার অর্থনীতির সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা এবং আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের রূপরেখা নির্ধারণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সরকারের আর্থিক, মুদ্রা ও বিনিময় হারসংক্রান্ত কোঅর্ডিনেশন কাউন্সিল এবং বাজেট মনিটরিং ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটির এই প্রথম বৈঠকে ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং তা মোকাবিলার কৌশল নির্ধারণ করা হবে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে, যেখানে ভর্তুকি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে কৃষি ও সারের ভর্তুকিও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, আগামী অর্থবছর থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ আংশিকভাবে বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও রয়েছে। এর পাশাপাশি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে কৃষিঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষি কার্ড চালুর মতো উদ্যোগও নিচ্ছে সরকার।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগের ফলে অর্থনীতির ওপর ব্যয়ের চাপ আরও বাড়ছে।
সব মিলিয়ে অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়লেও ব্যয় কমানোর সুযোগ সীমিত বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। ফলে আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার ৯ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর উদ্যোগও অব্যাহত থাকবে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট আগের বছরের তুলনায় সাত হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সে হিসাবে আগামী বাজেট প্রায় ১৪ শতাংশ বড় হতে পারে। সাধারণত প্রতি বছর বাজেট ১০ থেকে ১২ শতাংশ হারে বাড়ে, তবে গত অর্থবছরে এই ধারা থেকে ব্যতিক্রম দেখা গেছে।
এদিকে ব্যয় বাড়লেও রাজস্ব আয় একই হারে বাড়বে না বলে সরকার মনে করছে। সে কারণে আগামী বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছয় লাখ কোটি টাকার কিছু বেশি নির্ধারণ করা হতে পারে। ব্যয় মেটাতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। চলতি বাজেটে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ধারণা, আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব কিছুটা কমে আসতে পারে। সর্বোচ্চ জুন পর্যন্ত এই পরিস্থিতি স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সরকার জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম কিছুটা বাড়াতে পারে। যদিও তা পুরোপুরি ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না, কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্বিগুণ হওয়ায় পুরো সমন্বয় করলে দেশে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা সরকার এড়াতে চাইছে। ফলে ভর্তুকির বাড়তি চাপ আগামী বাজেটেও বহাল থাকতে পারে।
অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আগামী অর্থবছরে এটি ৬ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গড় মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনাও রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ।

