মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে বড় ধরনের সরবরাহ সংকট তৈরি করেছে। জ্বালানি বাজার থেকে শুরু করে মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিপুল অঙ্কের আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
সংস্থাটি জানিয়েছে, এই ধাক্কা মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদে ২০ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ব্যালান্স অব পেমেন্টস সহায়তার চাহিদা তৈরি হতে পারে। যুদ্ধ শুরুর পরপরই বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের পতন দেখা যায়। দৈনিক তেল সরবরাহ প্রায় ১৩ শতাংশ এবং এলএনজি সরবরাহ প্রায় ২০ শতাংশ কমে যায়, যা স্বাভাবিকভাবেই বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতির কারণ হয়।
যুদ্ধের আগে যেখানে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলারের মধ্যে ছিল, তা বেড়ে একসময় ১২০ ডলারে পৌঁছে। বর্তমানে দাম কিছুটা কমলেও আগের অবস্থায় ফেরেনি। ফলে জ্বালানি ব্যয় বাড়ার চাপ এখনো বিশ্বজুড়ে বহাল রয়েছে।
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা ৯ এপ্রিল এক বক্তৃতায় এসব তথ্য তুলে ধরেন। আসন্ন ‘স্প্রিং মিটিংস’-এর আগে দেওয়া ওই বক্তব্যে তিনি বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর সংঘাতের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। আগামী ১৩ থেকে ১৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ও অর্থমন্ত্রীরা অংশ নেবেন।
জর্জিয়েভা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রায় সব দেশকেই উচ্চমূল্যে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। কোন দেশ কতটা ক্ষতির মুখে পড়বে, তা নির্ভর করছে তাদের ভৌগোলিক অবস্থান, জ্বালানি নির্ভরতা এবং নীতিগত প্রস্তুতির ওপর।
জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল—উভয় ধরনের অর্থনীতিই এর অভিঘাত অনুভব করছে। তেল শোধন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ডিজেল ও জেট ফুয়েলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এতে পরিবহন ও বাণিজ্য খাতেও ব্যাঘাত তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ নতুন করে ক্ষুধার ঝুঁকিতে পড়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শিল্প খাতে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল আরও চাপের মুখে পড়েছে।
জর্জিয়েভা এই পরিস্থিতিকে একটি “বড়, বৈশ্বিক এবং অসম সরবরাহ ধাক্কা” হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত স্থিতিশীল বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আবারও কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। বর্তমানে সংঘাত কিছুটা স্থগিত থাকলেও এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, চলমান এই যুদ্ধসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহমর্মিতা জরুরি।
চলতি সপ্তাহে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বসন্তকালীন বৈঠককে সামনে রেখে বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন সংকট মোকাবিলার রূপরেখা নির্ধারণে জোর দিচ্ছেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। তিনি জানিয়েছেন, অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা একত্রিত হলে মূল আলোচ্য হবে—নতুন এই ধাক্কা কীভাবে সামাল দেওয়া যায় এবং এর প্রভাব কীভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। জর্জিয়েভা বলেন, পরিস্থিতি কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে হলে প্রথমেই ধাক্কার প্রকৃতি, প্রভাব বিস্তারের পথ এবং এর গভীরতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন বাস্তবসম্মত ও সমন্বিত নীতি।
অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব:
তার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এই সংকট তিনটি প্রধান উপায়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। প্রথমত, জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে ভোক্তা পর্যায়ে। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এবং সরবরাহ ঘাটতির কারণে চাহিদাও কমে যাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, ব্যয়বহুল মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্পমেয়াদি মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বেড়েছে, ইউরো অঞ্চলও একই প্রবণতায় রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রত্যাশা এখনো স্থিতিশীল আছে, যা কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত দেয়।
তৃতীয়ত, আর্থিক খাতেও এর প্রভাব পড়ছে। শুরুতে সহায়ক থাকা আর্থিক পরিবেশ ধীরে ধীরে কঠোর হয়েছে। উদীয়মান বাজারের বন্ডের স্প্রেড বেড়েছে, শেয়ারবাজারে সমন্বয় এসেছে এবং ডলারের মান শক্তিশালী হয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা শিথিলতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
নীতিগত সতর্কতা ও করণীয়:
আইএমএফ প্রধান শুরুতেই সতর্ক করে বলেন, এটি একটি নেতিবাচক সরবরাহ ধাক্কা। তাই চাহিদা সমন্বয় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে নীতিনির্ধারকদের এমন পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে পরিস্থিতি আরও জটিল না হয়। তিনি স্পষ্টভাবে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বা মূল্য নিয়ন্ত্রণের মতো একতরফা পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। তার ভাষায়, এসব উদ্যোগ বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে এবং সংকটকে আরও গভীর করতে পারে।
জর্জিয়েভা মনে করেন, অতীতের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী দ্রুত অভিযোজন এবং সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে কখন নীতির দিক পরিবর্তন করতে হবে, তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে অপেক্ষা ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণও কার্যকর কৌশল হতে পারে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে মূল্য স্থিতিশীলতার বিষয়ে তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করতে হবে। আর্থিক কর্তৃপক্ষের উচিত দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ও সাময়িক সহায়তা নিশ্চিত করা, যা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
যদি মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার বাড়াতে হবে বলে মত দেন জর্জিয়েভা। তবে তিনি সতর্ক করেন, সুদের হার বাড়ালে প্রবৃদ্ধি ধীর হবে—এটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে, যদি আর্থিক কঠোরতা চাহিদা সংকট তৈরি করে এবং তা সরবরাহ সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে মুদ্রানীতিকে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। প্রয়োজন হলে আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে চাহিদা বাড়াতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।
সহায়তার চাহিদা বাড়ার আশঙ্কা:
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে নিকট ভবিষ্যতে আইএমএফের ব্যালান্স-অব-পেমেন্টস সহায়তার চাহিদা বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেন জর্জিয়েভা। তার মতে, এই চাহিদা ২০ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে থাকতে পারে। তবে যুদ্ধবিরতি বজায় থাকলে নিম্নসীমা অর্থাৎ ২০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত কয়েক দশকে অনেক উদীয়মান অর্থনীতি সুশৃঙ্খল নীতি অনুসরণ করায় সংকটের প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত রয়েছে। একই সঙ্গে এই ধাক্কা মোকাবিলায় আইএমএফের পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।
সবশেষে জর্জিয়েভা বলেন, সংস্থাটির ১৯১টি সদস্য দেশ প্রয়োজনে এই সহায়তার ওপর নির্ভর করতে পারবে। পাশাপাশি, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার এই পরিস্থিতিতে দেশগুলোকে একত্রিত করে সামনে এগোনোর পথ খুঁজে বের করাই হবে আসন্ন বৈঠকের প্রধান লক্ষ্য।

