আগামী অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আয় বাড়াতে করছাড়ের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। এতে কর অব্যাহতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে চায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। লক্ষ্য হচ্ছে অতিরিক্ত কমপক্ষে ১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এক অর্থবছরে বিভিন্ন খাতে মোট করছাড়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ১৩২ কোটি টাকা। আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে এই অঙ্ক কমিয়ে ৯৭ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, প্রতি বছর কোন খাতে কী পরিমাণ করছাড় দেওয়া হচ্ছে, তা বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। পাশাপাশি এসব করছাড়ের কার্যকারিতা ও সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে এনবিআর শুল্ক, কাস্টমস ও আয়কর—এই তিন খাতে পৃথক তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। উপদেষ্টার মতে, কর পরিহার, কর অব্যাহতি ও কর জালিয়াতির প্রচলিত সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি সুশৃঙ্খল কর ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়াই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। এই টাস্কফোর্স আগামী অর্থবছরে করছাড় কমিয়ে কতটুকু অতিরিক্ত রাজস্ব আয় করা সম্ভব, তার একটি বাস্তবচিত্রও তুলে ধরবে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে এনবিআরের একটি সূত্র জানায়, আয়কর খাতে বিভিন্ন ধরনের করছাড় দীর্ঘদিন ধরে দেওয়া হচ্ছে, যদিও এ নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রভাবশালী গোষ্ঠী এসব করছাড়ের সুবিধা ভোগ করছে। ফলে প্রকৃত রাজস্ব আদায় ব্যাহত হচ্ছে। আবার তৈরি পোশাকসহ কিছু খাতে করছাড় শিল্প বিকাশে সহায়ক হলেও এখন এসব সুবিধা অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সূত্রটি আরও জানায়, রেমিট্যান্স খাতে দীর্ঘদিন ধরে আড়াই শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। এখন তা কিছুটা কমানো যায় কি না, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষি ও মৎস্য খাতে করছাড়ের ক্ষেত্রে অনিয়মের বিষয়ও সামনে এসেছে। এসব বিষয় বিশ্লেষণ করেই আগামী অর্থবছরে করছাড় কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। এতে কমপক্ষে ১০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয় সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
করছাড় বলতে বোঝায়, সরকার যখন কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক বা অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য নির্ধারিত হারের চেয়ে কম কর আদায় করে বা কোনো খাতকে করমুক্ত সুবিধা দেয়, তখন সেটিকে করছাড় বা কর অব্যাহতি বলা হয়। এটি মূলত এক ধরনের পরোক্ষ ভর্তুকি হিসেবে কাজ করে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের ওপরই পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের মতো ১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশে কর-জিডিপি অনুপাত এখনো বিশ্বের অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই অনুপাত ছিল ৭.৩০ শতাংশ, যা পরবর্তী অর্থবছরে আরও কমে ৬.৭৩ শতাংশে নেমে এসেছে বলে জানা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমানে এটি আরও নিচে নেমেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় গড় কর-জিডিপি অনুপাত যেখানে প্রায় ১২ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। একটি টেকসই উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এই অনুপাত অন্তত ১৫ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। সরকারও ২০৩০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্য ১৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
এনবিআরের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক অর্থবছরে মোট করছাড় বা অব্যাহতির বড় অংশ প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে দেওয়া হয়। হিসাব অনুযায়ী, তিন ভাগের দুই ভাগেরও বেশি করছাড় উদ্যোক্তা বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে গেছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে করছাড়ের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ৮১৪ কোটি টাকা। পরে ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে ১ লাখ ৭ হাজার ১৩২ কোটি টাকায় নেমে আসে। এই পরিমাণ ওই বছরের মোট জিডিপির প্রায় ২.৩৯ শতাংশের সমান।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, করপোরেট কর খাতে সবচেয়ে বেশি করছাড় দেওয়া হয়েছে। এই খাতে ছাড়ের পরিমাণ ৭৩ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা, যা মোট করছাড়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ। এই সুবিধা মূলত ক্ষুদ্রঋণ, সামাজিক কল্যাণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, তৈরি পোশাক, বস্ত্র ও সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে বেশি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ব্যক্তিগত আয়কর খাতে করছাড়ের পরিমাণ ৩৩ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা, যা মোট করছাড়ের প্রায় ৩১ শতাংশ। এর বড় অংশই বেতনভিত্তিক আয়কর ছাড়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রধান খাতভিত্তিক করছাড়ের মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরে সামাজিক সুরক্ষা ও মাইক্রোক্রেডিট খাতে ১২ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৭ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা এবং পণ্য পরিবহন সেবা খাতে ৫ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা করছাড় দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল, অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাই-টেক পার্ক, পোলট্রি ও মৎস্য এবং রেমিট্যান্স খাতেও বড় অঙ্কের করছাড়ের সুবিধা দেওয়া হয়।
অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট আয়কর আদায় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে প্রায় সমপরিমাণ অর্থ, অর্থাৎ ১ লাখ ৭ হাজার ১৬২ কোটি টাকা করছাড় হিসেবে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সরকারের রাজস্ব আদায় প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এতে বাজেট ঘাটতি পূরণে দীর্ঘমেয়াদে চাপ তৈরি হচ্ছে এবং অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকিও বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

