দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান ভিত্তি রপ্তানি খাত। এর মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্প এককভাবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। সমজাতীয় পণ্যসহ মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৬ শতাংশই আসে এই খাত থেকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতে টানা ধস দেখা যাচ্ছে। গত আট মাস ধরে তৈরি পোশাক রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে কমছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ দেশভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ—এই ৯ মাসে শীর্ষ ১০ রপ্তানি বাজারের অধিকাংশ দেশেই রপ্তানি আয় কমেছে। এই বাজারগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা, জাপান ও ডেনমার্ক।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব দেশের মধ্যে ৯টি বাজারেই আগের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি আয় হ্রাস পেয়েছে। একমাত্র ব্যতিক্রম স্পেন, যেখানে তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার জার্মানিতে রপ্তানি পতন সবচেয়ে বেশি। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে দেশটিতে রপ্তানি প্রায় ১৪ শতাংশ কমেছে। অর্থমূল্যে এই কমার পরিমাণ ৫৩ কোটি ডলার। ফলে রপ্তানি আয় ৩৮০ কোটি ডলার থেকে নেমে ৩২৭ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পতন দেখা গেছে ডেনমার্কে। দেশটিতে রপ্তানি কমেছে ১৩ দশমিক ৭২ শতাংশ। আগের ৮০ কোটি ডলার থেকে আয় নেমে এসেছে ৬৯ কোটি ডলারে। ফ্রান্সেও রপ্তানি কমার ধারা অব্যাহত রয়েছে। সেখানে ১২ দশমিক ২৬ শতাংশ কমে আয় দাঁড়িয়েছে ১৪৫ কোটি ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৬৫ কোটি ডলার।
ইপিবির এই পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো বড় বাজারসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যেই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যাচ্ছে না। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত চাপের মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে, পরিমাণের দিক থেকে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে পতন দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে দেশটিতে রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এই সময়ে রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৫৫৯ কোটি ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৫৭৪ কোটি ডলার।
দ্বিতীয় বৃহৎ রপ্তানি বাজার হিসেবে ফ্রান্সের অবস্থান রয়েছে। দেশটিতে একই সময়ে তুলনামূলকভাবে রপ্তানি কমেছে। তৃতীয় অবস্থানে থাকা যুক্তরাজ্যেও একই চিত্র দেখা গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসা এই দেশটিতে ৩৩০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩৩৬ কোটি ডলার। এতে রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৬১ শতাংশ।
এ পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা একাধিক কারণকে দায়ী করছেন। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সমকালকে বলেন, প্রায় সব বাজারেই রপ্তানি কমার পেছনে অভিন্ন কিছু কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন পাল্টা শুল্ক, শুল্কনীতির কারণে প্রতিযোগী দেশগুলোর আক্রমণাত্মক বাণিজ্য কৌশল এবং দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি। পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচন ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাও প্রভাব ফেলেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, “আমাদের ধারণা ছিল, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হলে অনেক অনিশ্চয়তা কেটে যাবে। এপ্রিল বা মে মাস থেকে ভালো রপ্তানি অর্ডার আসবে, যা আগস্ট নাগাদ রপ্তানি আয়ের হিসেবে প্রতিফলিত হবে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই প্রত্যাশাকেও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। এখন কবে রপ্তানি খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, তা বলা কঠিন।”
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বাজার সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত—প্রচলিত বাজার এবং অপ্রচলিত বা নতুন বাজার। দীর্ঘদিন ধরে যে বাজারগুলোতে রপ্তানি হয়ে আসছে, সেগুলোই প্রচলিত বাজার হিসেবে পরিচিত। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা ও যুক্তরাজ্য।
অন্যদিকে এই পরিসরের বাইরে থাকা দেশগুলোকে অপ্রচলিত বা নতুন বাজার হিসেবে ধরা হয়। এসব বাজারের মধ্যে জাপান এখন আকারে সবচেয়ে বড় গন্তব্য। শীর্ষ ১০ রপ্তানি বাজারের মধ্যে জাপানের অবস্থান নবম। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে দেশটিতে রপ্তানি হয়েছে ৭৯ কোটি ডলারের পোশাক, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৯৬ কোটি ডলার। এতে রপ্তানি কমেছে ৭ দশমিক ১১ শতাংশ।
এ ছাড়া অপ্রচলিত বাজারের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, ভারত, চীন, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, দক্ষিণ কোরিয়া ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোও রয়েছে। রপ্তানিকারকেরা এসব বাজারকে সম্ভাবনাময় উদীয়মান গন্তব্য হিসেবে দেখছেন, যেখানে ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে।

