২০২৭ সালের মধ্যে দেশজুড়ে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় কর মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা ও ধীরগতির অগ্রগতির পর এবার নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য কর ফাঁকি কমানো এবং দেশের নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত করা।
বর্তমানে বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম কম কর-জিডিপি অনুপাতের দেশ। রাজস্ব আদায়ের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যেই এই উদ্যোগ সামনে এলো। এক দশকের বেশি সময় ধরে ডিজিটালাইজেশনের নানা প্রকল্প চললেও এখন পর্যন্ত আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস খাতে অটোমেশনের অগ্রগতি সীমিতই রয়ে গেছে।
এনবিআরের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন পরিকল্পনার শুরু হবে বিদ্যমান অনলাইন রিটার্ন দাখিল ব্যবস্থা এবং ই-অডিট সিস্টেমকে পুরোপুরি কার্যকর করার মাধ্যমে। এরপর ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ের করদাতাদের জন্য ঝুঁকি-ভিত্তিক অডিট চালু করা হবে চলতি বছরের মধ্যেই। পাশাপাশি ব্যাংক, ভূমি অফিস এবং যানবাহন নিবন্ধন কর্তৃপক্ষসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর তথ্যের রিয়েল-টাইম সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এই সংযোগ সম্পন্ন হলে পূর্ণাঙ্গ মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হবে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, “অনেক করসেবা ইতোমধ্যে অনলাইনে রয়েছে। পরবর্তী ধাপে কর তথ্যকে অন্যান্য সরকারি ও আর্থিক ডাটাবেজের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। একবার এই সংযোগ স্থাপিত হলে লেনদেন আরও কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে এবং অনিয়মকারীদের দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।”
তবে এই সময়সীমা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, গত ১৫ বছরে একই ধরনের একাধিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তব অগ্রগতি খুবই সীমিত। দেশি-বিদেশি অর্থায়নে বড় বড় ডিজিটাল প্রকল্প নেওয়া হলেও প্রত্যাশিত অটোমেশন এখনো অর্জিত হয়নি।
সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আবদুল মজিদ মনে করেন, এক বছরের মধ্যে পূর্ণ অটোমেশন বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর ভাষায়, “১৯৯০-এর দশক থেকেই অটোমেশনের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু কার্যকর ফল খুব সীমিত।”
তিনি আরও বলেন, এনবিআরের ভেতরেই এ ধরনের ব্যবস্থার প্রতি যথেষ্ট সমর্থন আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কিছু কর্মকর্তা এবং কর ফাঁকিদার ব্যবসায়ীরা স্বচ্ছতা গ্রহণে আগ্রহী নাও হতে পারেন। অতীতে অনেক প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ, প্রশাসনিক কাজ ও লজিস্টিকেই সময় ও অর্থ ব্যয় হয়েছে, কিন্তু বাস্তব ফল খুব কম পাওয়া গেছে। মজিদ মনে করেন, ২০২৭ সালের লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী হলেও এনবিআরকে অবশ্যই এর বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকতে হবে। একই সঙ্গে কার্যকর ডাটা শেয়ারিং নিশ্চিত করতে সব সংস্থাকে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার ওপরও জোর দেন তিনি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এক দশক আগে প্রায় ১০ শতাংশ থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশে। এশিয়ার মধ্যে এটি অন্যতম সর্বনিম্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কর ফাঁকি, ব্যাপক কর ছাড় এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
কর ফাঁকির কারণে রাজস্ব ক্ষতির নির্দিষ্ট কোনো সরকারি হিসাব না থাকলেও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে এই ক্ষতির পরিমাণ ১ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি।
গত দেড় দশকে সরকার কর প্রশাসন ডিজিটাল করতে ১০টিরও বেশি উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অনলাইন টিআইএন নিবন্ধন, আয়কর রিটার্ন, ভ্যাট সিস্টেম, রিফান্ড ব্যবস্থা, কাস্টমস বন্ড অটোমেশন এবং ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো। তবে এসব ব্যবস্থার অনেকগুলোই এখনো আংশিকভাবে কার্যকর। উদাহরণস্বরূপ, অনলাইন আয়কর ব্যবস্থায় এখনো কিছু কাজ হাতে করতে হয়। একইভাবে ভ্যাট অটোমেশন ও কাস্টমস বন্ড সিস্টেমেও রয়েছে নানা জটিলতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু কর্মকর্তা বিরোধিতা, এনবিআরের বারবার নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে অগ্রগতি ধীর হয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ডাটা ইন্টিগ্রেশনও পিছিয়ে আছে, ফলে বাস্তবায়ন কার্যকর হচ্ছে না।
বর্তমানে কর কর্তৃপক্ষকে ব্যাংক, ভূমি অফিস, সিটি করপোরেশন এবং ইউটিলিটি সেবাদানকারী সংস্থাগুলো থেকে হাতে ডাটা সংগ্রহ করতে হয়। এতে বড় পরিসরে কর ফাঁকি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যাংকিং তথ্য ব্যবহারের কিছু উদ্যোগ থাকলেও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতার অভাবে অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

