নতুন সরকার গঠনের পর প্রথম জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থনীতিকে নতুন পথে এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। অতীতের প্রবৃদ্ধিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে এসে টেকসই, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলাই হবে এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য।
গত শুক্রবার জাতীয় সংসদে বিধি ৩০০-এর আওতায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তুত করা হচ্ছে নানা অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে। মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক খাতের ভারসাম্যহীনতা এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট ঘিরে জনসাধারণের উচ্চ প্রত্যাশার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে অতীত সরকারের রেখে যাওয়া সীমাবদ্ধতাগুলোকেও বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান।
অর্থমন্ত্রী জানান, আগামী এক দশকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ভোগ—এই চারটি উপাদানের একটি কার্যকর চক্র গড়ে তুলতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত বাজেট সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা চলছে, যাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও পরিশোধ ভারসাম্যের ওপর চাপ কমানো যায়। একই সঙ্গে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাও সরকারের অগ্রাধিকার।
সংস্কার কর্মসূচির অন্যতম প্রধান দিক হচ্ছে আর্থিক খাতে সুশাসন জোরদার করা। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনগত কাঠামো পুনর্গঠন এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তদারকি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পুঁজির ঘাটতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরকার উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রাজস্বভিত্তিক অর্থায়ন বাড়াতে চায়। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বন্ডবাজারকে শক্তিশালী করার উদ্যোগও রয়েছে। মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে আর্থিক নীতি পরিচালিত হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। একটি “ডায়নামিক ম্যাক্রো-ফিসক্যাল মডেল”-এর মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ পথে ঋণ ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং ধীরে ধীরে ঋণ-জিডিপি অনুপাত কমানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে।
সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় পাঁচটি প্রধান অগ্রাধিকার তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মূল্যস্ফীতি ৫-৬ শতাংশে নামিয়ে আনা, করের আওতা বাড়ানো ও রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা, পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কাজ করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ ঋণ সুবিধা দেওয়া এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে ব্যয় বাড়ানো।
পুঁজিগঠনেও বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের বদলে পুঁজিবাজারকেন্দ্রিক অর্থায়নে জোর দেওয়া হবে। এ জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে আরও স্বাধীনতা দেওয়া, বাজারে কারসাজি দমন এবং গত ১৫ বছরের অনিয়ম তদন্তের পরিকল্পনা রয়েছে। করপোরেট বন্ড, সুকুক ও গ্রিন বন্ডের মতো নতুন আর্থিক উপকরণ চালুর মাধ্যমে বাজারকে বৈচিত্র্যময় করার কথাও জানান তিনি।
বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, গত ১৬ বছরে ব্যাপক দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের ফলে দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে পড়ে। সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতগুলোও কার্যকারিতা হারিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরতে তিনি ২০০৫-০৬ অর্থবছর, ২০২৩-২৪ অর্থবছর এবং অন্তর্বর্তীকালীন ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনামূলক চিত্র উপস্থাপন করেন। তার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৭৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭.১৭ শতাংশ। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষে প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ৪.২২ শতাংশে, আর মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয় ৯.৭৩ শতাংশ।
শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধি ১০.৬৬ শতাংশ থেকে কমে ৩.৫১ শতাংশে নেমে এসেছে। কৃষিখাতে প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৩.৩০ শতাংশে, যা আগে ছিল ৫.৭৭ শতাংশ। শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না হওয়ায় তরুণরা কৃষিতে ঝুঁকছে, ফলে উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে এবং ‘ছদ্মবেকারত্ব’ বাড়ছে। বর্তমানে মোট কর্মসংস্থানের ৪১ শতাংশ কৃষিখাতে হলেও জাতীয় আয়ে এর অবদান মাত্র ১১.৬ শতাংশ, যা শ্রম উৎপাদনশীলতার দুর্বলতা এবং ‘চাকরিহীন প্রবৃদ্ধি’র ঝুঁকি নির্দেশ করে।
সঞ্চয় ও বিনিয়োগের ভারসাম্যও অবনতি হয়েছে। জাতীয় সঞ্চয়ের হার ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ২৯.৯৪ শতাংশ থাকলেও ২০২৩-২৪-এ তা কমে ২৮.৪২ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে টাকার মানও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে—ডলারের বিপরীতে ৬৭.২ টাকা থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১২১ টাকায়। এতে আমদানি ব্যয় ও জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে।
এছাড়া অর্থের জোগান ও রিজার্ভ অর্থের প্রবৃদ্ধিও কমে গেছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ১৮.৩ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪-২৫-এ ৬.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বিনিয়োগের ধীরগতির ইঙ্গিত দেয়। রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়া, কর ফাঁকি ও অপচয়ের কারণে সরকারের সম্পদ আহরণ সীমিত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাজেট ঘাটতি ২.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪.০৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগের সরকারের বড় প্রকল্পগুলো যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া বেশি ব্যয়ে বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এসব প্রকল্প থেকে জনগণ প্রত্যাশিত সুফল পায়নি, বরং বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে দাবি করেন অর্থমন্ত্রী।

