ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য সামনে রেখে আগামী অর্থবছরের জন্য বড় আকারের বাজেট প্রস্তুত করছে নতুন সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী বাজেটের আকার দাঁড়াতে পারে প্রায় ৯ দশমিক ৩০ ট্রিলিয়ন টাকা। মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকার খাতগুলোতে অতিরিক্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা।
সরকারি সূত্র জানায়, এই বিশাল ব্যয়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে প্রায় ৭ দশমিক ৯৫ ট্রিলিয়ন টাকা। শুক্রবার রাতে অর্থ, মুদ্রা ও বৈদেশিক বিনিময় সমন্বয় সংক্রান্ত কমিটির এক বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়। বাজেট প্রণয়নের আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু হয়েছে, আর বর্তমান অর্থবছর শেষ হতে বাকি আছে মাত্র দুই মাসের কিছু বেশি সময়।
সূত্রগুলো বলছে, আগামী বাজেটে সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব মোকাবিলা এবং সরকারি কর্মচারীদের আংশিক বেতন বৃদ্ধি—এসব কারণেই ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। ফলে বাজেটের আকারও উল্লেখযোগ্যভাবে বড় করা হচ্ছে। একজন কর্মকর্তা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ইতোমধ্যেই ভর্তুকির বড় একটি অংশ খেয়ে ফেলছে। তবে আগামী অর্থবছরে এর প্রভাব অর্থনীতিতে আরও গভীর হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে বাড়তি ব্যয় মেটাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বড় লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বমানের তুলনায় কম থাকায় রাজস্ব বৃদ্ধির চাপ আরও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) আগামী অর্থবছরে এই অনুপাত ৯.২০ শতাংশে উন্নীত করার পরামর্শ দিয়েছে, যা বর্তমানে প্রায় ৬.৬ শতাংশ।
নতুন বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ধরা হচ্ছে ৩ দশমিক শূন্য ট্রিলিয়ন টাকা, যা চলতি অর্থবছরের ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন টাকার তুলনায় অনেক বেশি। চলতি বছর পরে সংশোধিত এডিপি নেমে এসেছে ২ দশমিক ০ ট্রিলিয়ন টাকায়। এডিপির অর্থায়নের মধ্যে ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন টাকা আসবে সরকারি তহবিল থেকে, যা মোট ব্যয়ের ৬৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। বাকি ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন টাকা আসবে বৈদেশিক উৎস থেকে—মূলত প্রকল্প ঋণ ও অনুদান হিসেবে।
চলতি অর্থবছরে সংশোধিত এডিপিতে দেশীয় অর্থায়ন ছিল ১ দশমিক ২৮ ট্রিলিয়ন টাকা এবং বৈদেশিক অর্থায়ন ছিল ০ দশমিক ৭২ ট্রিলিয়ন টাকা। ফলে আগামী বাজেটে দেশীয় অর্থায়ন ৪৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং বৈদেশিক অর্থায়ন ৫২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো মিলিয়ে ৫৯১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন টাকা ব্যয় হয়েছে, যা সংশোধিত বরাদ্দের প্রায় ৩০ শতাংশ। এডিপির খাতভিত্তিক বণ্টনে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিডি)—৩৬৬ দশমিক ২০ বিলিয়ন টাকা। এরপর রয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ—৩২৯ দশমিক ০৩ বিলিয়ন টাকা।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে ২০৬ দশমিক ০৮ বিলিয়ন টাকা করা হচ্ছে, যা আগের সংশোধিত বাজেটের ৩১ দশমিক ২৮ বিলিয়ন টাকার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। এতে করে এটি ১৫তম স্থান থেকে তৃতীয় স্থানে উঠে আসছে। বিদ্যুৎ বিভাগ পাবে ১৯১ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন টাকা, আর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১৭৩ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন টাকা। এছাড়া প্রাথমিক ও গণশিক্ষা খাতে ১৬৮ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন টাকা এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে ১৩৮ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন টাকা উন্নয়ন বাজেট রাখা হচ্ছে।
বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে অর্থনীতিতে তৈরি হওয়া চাপ, বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানির বাড়তি ব্যয় এবং তার অর্থায়নের দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বাজেট প্রস্তুতকারীদের নির্দেশ দেন যেন যুদ্ধের প্রভাব, মূল্যস্ফীতির চাপ, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং অর্থনীতির ধীরে ধীরে শিথিলকরণের বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা হয়।

