নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যকার দূরত্বই এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়ার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ এবং উন্নয়ন সহযোগীরা। তাদের মতে, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির সময় এই ব্যবধান আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসছে।
এই উদ্বেগগুলো উঠে আসে রবিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ আয়োজিত একটি জ্ঞানবিনিময় অনুষ্ঠানে। “বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্তরণ: বাণিজ্য, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও কাঠামোগত সংস্কার” শীর্ষক এই আয়োজন করে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)। সহযোগিতায় ছিল অস্ট্রেলিয়ান হাই কমিশন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। তিনি বলেন, এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলেও, পরবর্তী ধাপের জন্য প্রস্তুতির ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে। তার মতে, সরকারের “স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি” যথেষ্ট উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলেও এতে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং কার্যকর প্রয়োগের অভাব রয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবদুর রহিম খান নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধানকে “প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছিন্নতা” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত নীতিমালা, এমনকি জাতীয় ট্যারিফ নীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোও অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের পর্যায়ে উপেক্ষিত থাকে।
তিনি আরও জানান, বাণিজ্য কৌশলে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। রপ্তানি ও আমদানি নীতির মধ্যে কার্যকর সংযোগ এখনো তৈরি হয়নি, যা সামগ্রিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে।
এছাড়া তিনি একটি “নীতি নিরাপত্তা সমস্যা”র দিকেও ইঙ্গিত করেন। তার ভাষায়, কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার আগেই বারবার নীতিমালা পরিবর্তন করা হচ্ছে, ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, “ট্রেন মিস হয়ে যায়নি… আমাদের শুধু আরও মনোযোগী হতে হবে।”
বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিত্ব করে টেক্সটাইল খাতের নেতা ফজলুল হক এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমরা একেবারেই প্রস্তুত নই, প্রয়োজনীয় সংশোধনের জন্য মানসিক প্রস্তুতিও নেই।”
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়া হলে বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আসবে। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলমান সমস্যা—বিশেষ করে চামড়া খাতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা—প্রমাণ করে নেতৃত্ব ও বাস্তবায়ন সক্ষমতায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বক্তব্য দেন অস্ট্রেলিয়ান হাই কমিশনের ক্লিনটন পবকে। তিনি বলেন, সংস্কার বাস্তবায়নের প্রাথমিক সংকেতই বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি রাজস্ব খাতে সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেন এবং ধীরে ধীরে শুল্ক নির্ভরতা কমানোর পরামর্শ দেন। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন, জ্বালানি নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে অস্ট্রেলিয়া আগ্রহী।

