মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন করে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। পরিস্থিতির এই পরিবর্তনে আসন্ন বসন্তকালীন বৈঠকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমাতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির আগাম সতর্কতা দিতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়েছে রয়টার্স।
আজ থেকে ওয়াশিংটনে শুরু হচ্ছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী ও শীর্ষ নীতিনির্ধারকেরা এতে অংশ নিচ্ছেন। কভিড-১৯ মহামারি এবং ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতকে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য তৃতীয় বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার আভাস থাকায় প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়তে পারে এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সংঘাত শুরু হওয়ার পর সেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি কমে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রাক্কলন অনুযায়ী, উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। আগে এটি ৪ শতাংশ ধরা হয়েছিল। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই হার আরও কমে ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এসব দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা আগে ৩ শতাংশ ছিল। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে এটি ৬ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়তে পারে। বিশেষ করে সার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় কৃষি উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে সহায়তা দিতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।
স্বল্প আয়ের এবং জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য জরুরি সহায়তার চাহিদা ২ হাজার কোটি থেকে ৫ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছে আইএমএফ। একই সময়ে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, স্বল্প মেয়াদে প্রায় আড়াই হাজার কোটি ডলার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ছয় মাসে সর্বোচ্চ ৭ হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত সহায়তা দিতে তারা প্রস্তুত।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে সরকারগুলোকে লক্ষ্যভিত্তিক ও স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। তারা সতর্ক করেছেন, অতিরিক্ত ও বিস্তৃত ভর্তুকি বা সহায়তা দিলে উল্টো মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা বলেছেন, অতীতেও বিভিন্ন সংকট মোকাবিলা সম্ভব হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা। তার মতে, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং ভবিষ্যতে বিপুল সংখ্যক কর্মক্ষম মানুষের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করা।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়াকে আরও কঠিন করে তুলছে। এতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক উন্নয়নশীল দেশ ইতোমধ্যে উচ্চ ঋণ, কম বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সীমিত আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে এই সংকটে প্রবেশ করেছে। ফলে পরিস্থিতি তাদের জন্য আরও জটিল হয়ে উঠছে। এমন প্রেক্ষাপটে ঋণ পুনর্গঠন, স্বল্প সুদে অর্থায়ন এবং কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।

