দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) খাত অর্থনীতির বড় একটি ভিত্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এক কোটিরও বেশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এই খাতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত আছেন তিন কোটিরও বেশি মানুষ। জাতীয় অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ।
তবে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটি দীর্ঘদিন ধরেই একাধিক কাঠামোগত সমস্যার মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে ঋণপ্রাপ্তি, প্রশিক্ষণ, দক্ষ জনবল এবং নীতিসহায়তার ঘাটতি—এসবই উদ্যোক্তাদের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে পুঁজির অভাবকে।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় একটি অংশ ব্যবসা শুরু করে ধারদেনার ওপর নির্ভর করে। প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাবে শুরু থেকেই তারা চাপে থাকেন। ফলে ব্যবসার শুরুর ধাপেই অনেকেই টিকে থাকার লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়েন।
প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিয়েও অনেক উদ্যোক্তা পরবর্তী সময়ে টিকতে পারেন না। অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় উচ্চতর প্রশিক্ষণের সুযোগও সীমিত। ফলে প্রশিক্ষিত উদ্যোক্তাদের একটি অংশও দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে ব্যর্থ হন।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা কোনো কার্যকর ব্যবসায়িক নীতি না থাকায় তারা প্রচলিত নিয়ম-কানুনের মধ্যেই ব্যবসা পরিচালনা করতে বাধ্য হন। এতে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তারা পিছিয়ে পড়েন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, এ খাতের প্রধান সমস্যা হলো আর্থিক সহায়তায় প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতা। তিনি বলেন, “ছোট উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা পান না। ব্যাংকগুলো অনেক সময় ঋণ দিতে আগ্রহী হয় না। পাশাপাশি বাজারজাতকরণে দুর্বলতা এবং বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাও বড় চ্যালেঞ্জ। নীতিসহায়তার ঘাটতিও রয়েছে। ছোট ও বড় প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট-ট্যাক্স প্রায় একই হওয়ায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা চাপের মধ্যে থাকেন। ঢাকার বাইরে থাকা উদ্যোক্তারা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সহায়তা পান না।” তিনি আরও জানান, এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে ধীরে ধীরে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখলেও এসএমই খাত এখনো কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতি সহায়তা, সহজ ঋণপ্রাপ্তি এবং দক্ষতা উন্নয়ন বাড়াতে না পারলে এই খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।
দেশে এসএমই খাতে প্রায় এক কোটি উদ্যোক্তা এবং তিন কোটি মানুষ যুক্ত:
দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) খাত এখন কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির অন্যতম বড় ভিত্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ১ কোটিরও বেশি এসএমই উদ্যোক্তা রয়েছেন। এ খাতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জড়িত আছেন প্রায় ৩ কোটি মানুষ। জাতীয় অর্থনীতিতে (জিডিপি) এ খাতের অবদান প্রায় ২৮ শতাংশ।
এ খাতের বিস্তৃত গুরুত্ব তুলে ধরে এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনোয়ার হোসেন চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, “দেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ এসএমই উদ্যোক্তা রয়েছে। প্রায় ৩ কোটি ৭ লাখ মানুষ সরাসরি এই খাতে নিয়োজিত। জাতীয় অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান প্রায় ২৮ শতাংশ। এত বড় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা খাতকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।”
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বিপুল সংখ্যক উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সঠিক নীতিসহায়তা ও কাঠামোগত সমর্থন বাড়াতে না পারলে এই খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে। দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) খাতের উন্নয়নে প্রশিক্ষণ, মেলা আয়োজন এবং বিভিন্ন ধরনের সহায়তা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এসএমই ফাউন্ডেশন। উদ্যোক্তা তৈরি থেকে শুরু করে বাজার সম্প্রসারণ পর্যন্ত নানা পর্যায়ে সহায়তা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৫০ হাজার উদ্যোক্তা সরাসরি তাদের সেবা গ্রহণ করেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার উদ্যোক্তা এ সেবার আওতায় এসেছেন। এছাড়া পরোক্ষভাবে সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ১২ হাজার এমএসএমই উদ্যোক্তাকে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, বিদ্যমান উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, পণ্যের ডিজাইন ও মানোন্নয়ন, পণ্য বহুমুখীকরণ, বাজারজাতকরণ এবং দেশি-বিদেশি মান সনদ ও জিআই স্বীকৃতি অর্জনে সহায়তা করছে। পাশাপাশি রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখছে এসএমই ফাউন্ডেশন।
পুঁজি সংকটেই বড় বাধা:
তবে এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে পুঁজির অভাব ও সহজ ঋণপ্রাপ্তি। অনেক উদ্যোক্তাই জানান, ব্যবসার শুরু থেকেই ধারদেনার ওপর নির্ভর করতে হয়, যা পরবর্তী সময়ে টিকে থাকার লড়াইকে কঠিন করে তোলে।
এসএমই উদ্যোক্তা নাজনীন হাবিব বলেন, “মাত্র ৫০ হাজার টাকা ধারদেনা করে ব্যবসা শুরু করেছিলাম। পরে আবার পরিবার থেকে ২ লাখ টাকা ধার নিতে হয়েছে। এখন আমার ব্যবসা প্রায় ২০ লাখ টাকার হলেও ব্যাংক থেকে ঋণ পাচ্ছি না। আমাদের মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য পুঁজিই সবচেয়ে বড় সমস্যা।”
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান আরেক উদ্যোক্তা আমান উল্লাহ। তিনি বলেন, “এসএমই খাতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নিজস্ব পুঁজির অভাব। ব্যাংকগুলোও সহজে ঋণ দিতে চায় না।”
আরেক উদ্যোক্তা ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, “ব্যাংক আমাদের ট্রাস্ট করে না। অনেক সময় ব্যাংক লেনদেন না থাকলে ঋণ পাওয়া যায় না। অথচ যাদের বড় অঙ্কের টাকা আছে, তাদের ঋণ সহজে দেওয়া হয়।” উদ্যোক্তা জুয়েনা ফেরদৌস বলেন, “ছোট পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করলে ধীরে ধীরে এগোতে হয়। ব্যাংকিং সহায়তা সহজ না হওয়ায় অনেকেই পিছিয়ে পড়েন।”
নীতিগত ও আর্থিক সহায়তার দাবি:
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এসএমই খাতকে শক্তিশালী করতে হলে সহজ ঋণপ্রাপ্তি, নীতিগত সহায়তা এবং বাস্তবমুখী আর্থিক কাঠামো আরও জোরদার করা জরুরি। তা না হলে বিপুল সম্ভাবনাময় এই খাতের পূর্ণ বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে।
দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) খাতে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সীমিত থাকায় অনেক প্রশিক্ষিত উদ্যোক্তাও দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারছেন না। বিশেষ করে উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত ‘নার্সিং’ সহায়তার ঘাটতি এ খাতের বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উঠে এসেছে।
ব্যাগ, হোম ডেকর ও হস্তশিল্প পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান আহ্লাদ ফ্যাশনসের কর্ণধার জুয়েনা ফেরদৌস জানান, প্রশিক্ষণের সুযোগ প্রধানত ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের উদ্যোক্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি বলেন, “আমি রংপুরের মেয়ে হিসেবে রংপুরে কোনো প্রশিক্ষণ পাইনি। ঢাকায় এসে প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। এতে নিজেকে প্রস্তুত করতে অনেক সময় লেগেছে।”
তিনি আরও বলেন, দক্ষ কর্মী তৈরি করাও বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশিক্ষিত জনবল না থাকায় অনেক সময় নিজস্ব অর্থায়নে কর্মী গড়ে তুলতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। প্রশিক্ষণ ও নীতিসহায়তা নিয়ে তিনি বলেন, “প্রতি বছর নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে, কিন্তু তাদের টিকিয়ে রাখার মতো পর্যাপ্ত সহায়তা নেই। বাজারজাতকরণ ও বাস্তবভিত্তিক সহায়তা ছাড়া এই উদ্যোক্তারা টেকসই হতে পারবে না।”
এ বিষয়ে এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, প্রশিক্ষণের পর খুব অল্পসংখ্যক উদ্যোক্তা ঝরে পড়ে। নিয়মিত ফলোআপ করা হয় এবং উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে কাজ চলছে। তিনি বলেন, “আমরা প্রশিক্ষিত উদ্যোক্তাদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ, মার্কেটিং, প্রযুক্তি ব্যবহার ও দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছি। তবে এই কার্যক্রম আরও বড় পরিসরে নেওয়া প্রয়োজন।”
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা মনে করেন, এসএমই খাতের জন্য পৃথক ও কার্যকর নীতিমালার অভাব তাদের বড় দুর্বলতা। বড় শিল্পের মতো একই নিয়মে চলতে গিয়ে অনেক সময় তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। প্লাস্টিকের খেলনা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আমান প্লাস্টিক টয়েজ ইন্ডাস্ট্রিজের উদ্যোক্তা আমান উল্লাহ বলেন, “এসএমই খাতের জন্য আলাদা কোনো নীতি নেই। বড় শিল্পের মতো একই আইন-কানুন মেনে চলতে হয়, যা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য কঠিন হয়ে যায়।”
অর্গানিক কসমেটিক্স প্রতিষ্ঠান ‘রিবানা’র উদ্যোক্তা মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ছোট শিল্প প্লট ও বাস্তবভিত্তিক অবকাঠামো সহায়তা প্রয়োজন। তিনি বলেন, “বড় প্লট বেশি থাকায় ছোট উদ্যোক্তারা সুযোগ পান না। মাইক্রো পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের জন্য পরিকল্পিত সহায়তা দরকার।”
তিনি আরও বলেন, অনলাইন ও ই-কমার্স খাতেও স্থিতিশীলতা নেই। আগে বুস্টিং নির্ভর বিক্রি হলেও এখন অ্যালগরিদমভিত্তিক পরিবর্তনের কারণে অনেক উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বদলে গেছে।
জাতীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সমিতি বাংলাদেশের (নাসিব) সভাপতি মির্জা নূরুল গণী শোভন বলেন, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার, আমদানি-রপ্তানি জটিলতা এবং জ্বালানি সংকট এ খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এসএমই খাত আরও নাজুক অবস্থায় পড়তে পারে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত এবং অর্ডার কমে যাওয়ায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তিনি সরকারের কাছে সহজ শর্তে ঋণ, প্রণোদনা তহবিলে প্রবেশ সহজ করা এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

