রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে গত ৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত এক বহুপক্ষীয় পরামর্শ সভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট ভাষায় জানান, এলডিসি উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। সাংবাদিকদের সামনে তিনি ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক ঋণ, অভ্যন্তরীণ দেনা এবং উচ্চ সুদে ঋণনির্ভরতার ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন। একই দিনে জাতিসংঘের হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ অফিস একটি স্বাধীন মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, যোগ্যতার সূচক পূরণ করলেও বাণিজ্য প্রস্তুতি, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।
অপ্রস্তুতির এই চিত্র পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট। বিশ্বব্যাংকের মাইক্রোসিমুলেশন প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ২ শতাংশে। এই প্রবণতা দীর্ঘদিনের অগ্রগতিকে আংশিকভাবে পিছিয়ে দিয়েছে। একই বছরে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ঋণ টেকসইতা বিশ্লেষণে বাংলাদেশের অবস্থান ‘নিম্ন ঝুঁকি’ থেকে ‘মধ্যম ঝুঁকি’তে নেমে আসে। লজিস্টিকস ব্যয় জিডিপির ১৬ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় ১০ শতাংশ। ব্যাংকিং খাতও খেলাপি ঋণের চাপে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এসব বাস্তবতাই সামনে এনে দিচ্ছে আসন্ন সময়ের গুরুত্ব।
নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরণ করবে। ১৯৭৫ সাল থেকে বহন করা এই পরিচয় থেকে বেরিয়ে আসা নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতার তিনটি মানদণ্ডে ধারাবাহিকভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে দেশ। তবে যোগ্যতা অর্জন আর বাস্তব প্রস্তুতি এক বিষয় নয়। ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সরকার নিজেই উত্তরণের সময় বাড়ানোর আবেদন জানায়, যা ভেতরের অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত বহন করে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এই প্রস্তুতিকে প্রভাবিত করেছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন। তার সরকার এলডিসি উত্তরণকে বড় অর্জন হিসেবে দেখলেও উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের গতি ছিল সীমিত। রপ্তানি বৈচিত্র্য, শ্রম ও পরিবেশ মান উন্নয়ন, ব্যাংকিং সংস্কার এবং জিএসপি+ যোগ্যতা অর্জনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও তা পর্যাপ্ত ছিল না। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বর্তমান বাস্তবতায় এলডিসি উত্তরণকে ঘিরে ছয়টি বড় ঝুঁকি সামনে এসেছে। এগুলো হলো—বাণিজ্য সুবিধা হারানো, রাজস্ব কাঠামোর দুর্বলতা, ঋণের চাপ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা, কাঠামোগত প্রতিযোগিতার ঘাটতি এবং জলবায়ু অর্থায়নে সীমিত প্রবেশাধিকার। এসব চ্যালেঞ্জ দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস। তাকে ঘিরে উচ্চ প্রত্যাশা থাকলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এলডিসি উত্তরণ পরিকল্পনা গুরুত্ব হারায়। স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গৃহীত হয়, যা বাস্তবায়নের জন্য সময়কে অত্যন্ত সীমিত করে তোলে।
বর্তমানে বাংলাদেশের ৭৫ থেকে ৭৮ শতাংশ রপ্তানি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও জাপানে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পায়। উত্তরণের পর এই সুবিধা কমে যাবে। ইইউতে শুল্ক ৯ থেকে ১২ শতাংশ, কানাডায় ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ এবং জাপানে ৭ থেকে ১৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে তৈরি পোশাক খাতে, যা দেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি এবং যেখানে ৪০ লাখেরও বেশি শ্রমিক কর্মরত। আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, এলডিসি সুবিধা হারালে বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় কমতে পারে।
শুধু পোশাক নয়, ওষুধ খাতও চাপে পড়বে। ট্রিপস সুবিধা শেষ হলে দেশীয় জেনেরিক ওষুধ শিল্পকে কঠোর পেটেন্ট ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে, যা উৎপাদন খরচ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সহজ ঋণ সুবিধা থেকে সরে বাজারভিত্তিক ঋণে যেতে হবে, ফলে ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়বে। জিএসপি+ বিকল্প হিসেবে থাকলেও এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং সব পণ্য এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে ক্ষমতায় আসে। দলের নেতা তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তার সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন এবং শিল্পখাতকে পুনরুজ্জীবিত করা। একই সঙ্গে জিএসপি+ নিয়ে আলোচনা, রপ্তানি বৈচিত্র্য এবং ব্যাংকিং সংস্কার এগিয়ে নিতে হবে।
দেশের শীর্ষ ১৬টি ব্যবসায়িক সংগঠন ৩ থেকে ৫ বছর উত্তরণ স্থগিতের দাবি জানিয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সময় বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। কাঠামোগত সংস্কার ও নীতিগত দৃঢ়তাই এখানে মূল বিষয়।
এলডিসি উত্তরণকে শেষ লক্ষ্য হিসেবে নয়, বরং একটি নতুন সময়সীমা হিসেবে দেখার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। ২৪ নভেম্বরের পর আর কোনো বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা থাকবে না। তখন দেশের সক্ষমতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছাই হবে প্রধান ভরসা। উত্তরণের স্বীকৃতি অর্জন গুরুত্বপূর্ণ, তবে তা ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন কার্যকর সংস্কার, শক্তিশালী কূটনীতি এবং অর্থনীতির বৈচিত্র্য।
- ড. প্রণব কুমার পাণ্ডে: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক।

