বেক্সিমকো গ্রুপের ৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কোরতোয়া সোলার প্ল্যান্টের নির্মাণ কাজ এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। মূলত তহবিল সংকট এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের অনীহার কারণে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ ঝুলে গেছে বলে জানা গেছে।
২০২১ সালে সোলার প্রকল্প দুইটি এবং টেক্সটাইল খাত সম্প্রসারণের জন্য বেক্সিমকো সুকুক বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে ৩০ বিলিয়ন টাকা সংগ্রহ করেছিল। সেই অর্থ দিয়েই ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার তিস্তা সোলার প্ল্যান্ট এবং কোরতোয়া প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে তিস্তা সোলার প্ল্যান্ট ২০২৩ সালের আগস্টে উৎপাদনে যায়, তবে কোরতোয়ার কাজ এখনো আংশিকভাবে অসমাপ্ত।
২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বেক্সিমকো গ্রুপের আর্থিক সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের তথ্য সামনে আসে। একই সঙ্গে গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার পর শ্রমিক অসন্তোষসহ নানা জটিলতা তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে কোম্পানি কোরতোয়া সোলার প্ল্যান্ট শেষ করতে তিস্তা প্রকল্পের আয় থেকে ২ বিলিয়ন টাকা ব্যবহারের আবেদন করেছে।
তবে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)-এর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, যিনি সুকুক বন্ডের ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক তিস্তা প্ল্যান্টের আয় অন্য কাজে ব্যবহার না করার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে অনেক সুকুক হোল্ডারও বেক্সিমকোর অন্য প্রকল্পে এই অর্থ ব্যয় করার বিরোধিতা করছেন।
তিস্তা সোলার প্ল্যান্টটি সরকারের সঙ্গে ২০ বছরের চুক্তির আওতায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। সুকুক বন্ডের মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরেই শেষ হতে যাচ্ছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের মূলধন ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও তৈরি হয়েছে। আইসিবি সূত্রে জানা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে তিস্তা প্ল্যান্ট থেকে আসা আয় মূলধন ফেরত দেওয়ার জন্য সংরক্ষণ করা উচিত। গোপনীয়তার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা এ তথ্য জানান।
এ পর্যন্ত তিস্তা প্রকল্প ও টেক্সটাইল খাত মিলিয়ে ট্রাস্টি মোট ১৬.২৭ বিলিয়ন টাকা আয় পেয়েছে। এর মধ্যে ৩.৬৩ বিলিয়ন এসেছে টেক্সটাইল ডিভিশন থেকে ডিভিডেন্ড হিসেবে। এই আয়ের মধ্যে ১১.৭৩ বিলিয়ন টাকা ইতিমধ্যে সুকুক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি তিস্তা প্ল্যান্টের রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয়েছে ৩.১০ বিলিয়ন টাকা। বর্তমানে ট্রাস্টির হাতে অবশিষ্ট রয়েছে ৫.০৭ বিলিয়ন টাকা। এই অর্থ থেকেই বেক্সিমকো ২ বিলিয়ন টাকা চেয়েছে।
আইসিবি কর্মকর্তা আরও জানান, জুন শেষে সুকুক হোল্ডারদের কুপন পরিশোধ করতে ১.৪৭ বিলিয়ন টাকা প্রয়োজন হবে। ফলে পরবর্তী ব্যবহারের জন্য হাতে থাকবে প্রায় ৩.৬০ বিলিয়ন টাকা। ২০২১ সালে সংগ্রহ করা ৩০ বিলিয়ন টাকার মধ্যে ২ বিলিয়ন টাকার সিকিউরিটিজ ইতিমধ্যে শেয়ারে রূপান্তরিত হয়েছে। তাই মেয়াদ শেষে কোম্পানিকে ২৮ বিলিয়ন টাকা ফেরত দিতে হবে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের জুনে ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহমেদের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে, যা সুকুক বন্ডের ঝুঁকি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনে মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ দেওয়ার জন্য কাজ করছে। কমিটিতে সুকুক ক্রয়কারী কয়েকটি ব্যাংকের প্রতিনিধিরাও ছিলেন।
গত বছরের ডিসেম্বরে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে কমিটি জানায়, কোরতোয়া প্ল্যান্ট চালু হলে ২০৩১ সালের মধ্যে মূলধন পরিশোধ সম্ভব হবে। অন্যথায় সময়সীমা বাড়িয়ে ২০৩২ সাল পর্যন্ত নিতে হতে পারে।
আইসিবি কর্মকর্তা বলেন, তিস্তা প্ল্যান্টের কার্যকারিতা দেশের বিদ্যুৎ সংকটের প্রেক্ষাপটে ভালো হলেও মূল সমস্যা হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সুকুক বিনিয়োগকারীরা এখন বেক্সিমকোকে আর্থিক সহায়তা দিতে আগ্রহী নন, কারণ কোম্পানিটি বিতর্কিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

