টানা ৫০ মাস ধরে দেশে মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতির হার বেশি থাকায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে কমে যাচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো, যাদের অনেকেই এখন বাধ্য হচ্ছেন পুষ্টিকর খাবার কমিয়ে শুধুই টিকে থাকার ন্যূনতম খাদ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে।
সরকারি ও অর্থনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এখনো তা ৮ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। এতে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে দেখা যায়, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির পর থেকে মজুরি কিছুটা বাড়লেও তা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলাতে পারেনি। মার্চ মাসে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.০৯ শতাংশ, যেখানে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৭১ শতাংশ। ফলে ব্যবধান দাঁড়ায় ০.৬২ শতাংশ পয়েন্টে। এ নিয়ে টানা ৫০ মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে বেশি হারে মূল্যস্ফীতি চলছে। এতে বাস্তব আয়ের অবস্থা ক্রমাগত নেতিবাচক হয়ে পড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
পটুয়াখালীর মহিপুরে জেলে রফিক মাঝি মাছ ধরে দিনে গড়ে প্রায় ৫০০ টাকা আয় করেন। তবে গত কয়েক বছরে তার আয় প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে অনেক।
করোনা-পরবর্তী সময়ে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করলে তিনি প্রথমেই প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার কমিয়ে দেন। এখন তার পরিবারে মাছ ও ডিম খুবই কম আসে। অনেক সময় শুধু ভাত ও সবজি দিয়েই দিন পার করতে হয়। মাছ ধরা বন্ধ বা জ্বালানি সংকটের সময় তাকে ধার-দেনার ওপর নির্ভর করতে হয়। আসন্ন মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন।
একই অবস্থা মহিপুর ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টারের কর্মী কবির হোসেনের। তিনি জানান, সন্তানের চাহিদা থাকলেও ভালো খাবার দেওয়া সম্ভব হয় না। প্রতি মাসেই তাকে ধার করতে হয়।
লালমনিরহাটের রাজপুর ইউনিয়নের কৃষি শ্রমিক প্রশান্ত কুমার রায় আগে মৌসুমে মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করতেন। এখন তা কমে ১৪ হাজার টাকার নিচে নেমে এসেছে। তিনি জানান, খরচ বাড়ায় সঞ্চয় প্রায় শেষ হয়ে গেছে। অসুস্থতা বা জরুরি প্রয়োজন হলে এখন বাধ্য হয়ে ঋণ নিতে হয়, যা ঋণের বোঝা আরও বাড়াচ্ছে।
দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে। এখানে প্রায় ৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষ কাজ করেন। এদের বড় একটি অংশ এখন দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছে বা ইতোমধ্যে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ লুৎফর রহমান বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষ এখন মাছ, মাংস, দুধ, ডিম ও ফলমূলের মতো প্রোটিনজাত খাবার কমিয়ে শুধুই টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালোরি গ্রহণ করছে।
তার মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে কর্মক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তিনি আরও বলেন, শ্রমবাজারে চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়েছে, আবার নতুন শ্রমিকও বাড়ছে। ফলে মজুরির ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
সরকারের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) জানিয়েছে, জ্বালানি ও ইউটিলিটির দাম বাড়ায় নিম্ন আয়ের মানুষ আরও বেশি চাপে পড়ছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন খরচ বাড়ায় তাদের প্রকৃত আয় আরও কমে যাচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধির এই ব্যবধান ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন করে তুলছে।
বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও কমতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসহ বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের চাপ ও বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে।

