বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশের ভেতরে জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চাপ আরও তীব্র হয়েছে। সব মিলিয়ে জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগোতে হচ্ছে এই খাতের উদ্যোক্তাদের।
এই প্রেক্ষাপটে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।
চলতি অর্থবছরে রফতানিতে ধারাবাহিকভাবে পতন ঘটছে, কেন? যেহেতু ব্যাংকিং সেক্টরের ঋণের বড় অংশ তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে, ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে গেলে পতন নিয়ে উনারাও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। আপনাদের মূল্যায়ন কী?
এ অর্থবছরের জুলাই মাসটা ভালো ছিল। আগস্ট থেকে রফতানিতে পতন শুরু হলো। এর প্রধান কারণ ইউএস ট্যারিফ। এটি সব পর্যায়ে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছিল—ক্রেতা, রিটেইলার, ম্যানুফ্যাকচারার এবং বায়িং হাউজ সবার মধ্যে। কারণ পরিস্থিতিটা ছিল আনপ্রেডিক্টেবল; কী হবে, হতে যাচ্ছে তা কেউ জানত না। এ অনিশ্চয়তার কারণে বিভিন্ন দেশ যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নেগোসিয়েশন শুরু করল, বায়াররাও তখন ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ নীতি নিল। এর একটা প্রভাব বাজারে পড়েছে।
ট্যারিফ নেগোসিয়েশন যখন ২০ শতাংশে গিয়ে শেষ হলো, আমরা প্রাথমিকভাবে মনে করেছিলাম জিতে গেছি। কারণ আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ চীন ও ভারতের অবস্থা আমাদের চেয়ে খারাপ ছিল, আর পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের অবস্থা ছিল আমাদের সমান। কিন্তু আসলে এটি আমাদের জন্য জয় ছিল না। কারণ চীন ও ভারত যখন দেখল ট্যারিফ পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে নেই, তারা ইউরোপের বাজারে অত্যন্ত অ্যাগ্রেসিভ প্রাইসিং দিল। ফলে ইউরোপিয়ান বায়াররা আবার তাদের দিকে ছুটল।
আমরা যখন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ফোকাস করছি, তখন প্রভাব দেখা গেল মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোক্তাদের দিক থেকে। কারণ দিন শেষে এ ২০ শতাংশ বাড়তি ট্যারিফের বোঝা চূড়ান্ত ভোক্তার কাঁধেই যাবে। আমাদের যে মার্জিন, তাতে বাড়তি ২০ শতাংশ ট্যারিফ দিয়ে ব্যবসা করা সম্ভব না। এর ফলে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের চাহিদা বা কনজাম্পশন কমে গেল। আর কনজাম্পশন যখন কমল, তখন স্বাভাবিকভাবেই অর্ডার প্লেসমেন্টও কমে গেল।
ব্যাংক বা অন্যান্য খাতের উদ্যোক্তারা আমাদের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন কারণ তাদের ব্যবসা নির্ভর করে টার্নওভার বা ভলিউমের ওপর। কিন্তু আমরা শুধু ভলিউম নয়, ভলিউমের পাশাপাশি রিটেনশন নিয়েও কাজ করি। আমরা ১০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি করলে ব্যাংক বা অন্য সার্ভিস প্রোভাইডারদের আয় এটার ওপর নির্ভর করে। আমরা ১০ বিলিয়নের জায়গায় ৯ বিলিয়ন করলেও আমাদের রিটেনশন সমান বা তার বেশি রাখার সুযোগ থাকে।
তবে আমি এটা বলছি না যে এক্সপোর্ট কমার পরও আমার মার্জিন আগের মতোই আছে। সব মিলিয়েই রফতানি নিম্নমুখী হয়েছে। আমরা ও বায়াররা আশাবাদী ছিলাম নির্বাচনের পর পরিস্থিতি ইতিবাচক হবে। তা হচ্ছিলও, কিন্তু মিডল ইস্টের যুদ্ধের কারণে আমরা আবার একটা জায়গায় থমকে দাঁড়িয়েছি। আশা করি যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি হলে ভলিউমের দিক থেকে আবারো ভালো অবস্থানে ফিরতে পারব।
যুদ্ধের কিছু প্রভাব এরই মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। সেই সমস্যাগুলো জানতে চাই।
আমাদের জ্বালানি, বিশেষ করে এলএনজি এবং অন্যান্য ফুয়েল মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। যদিও ডিজেল বা পেট্রল আমরা অন্য সোর্স থেকে নেই, কিন্তু এলএনজি সরবরাহ যখন অনিশ্চিত হয়ে গেল, তখনই কনসার্ন তৈরি হলো যে ঠিকমতো বিদ্যুৎ বা গ্যাস পাব কিনা। তারপর হলো দাম। বাংলাদেশ সরকার এখনো দাম বাড়ায়নি, কিন্তু এর চেইন ইমপ্যাক্ট বা প্রভাব এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে।
যেমন পেট্রোকেমিক্যালের বাই-প্রডাক্ট থেকেই আমাদের অনেক র-ম্যাটেরিয়াল আসে। আমরা যে পলিব্যাগ, ফিলামেন্ট ইয়ার্ন বা পলিয়েস্টার ফাইবার ব্যবহার করি, সেগুলোর দাম বাড়তে শুরু করেছে। ডাইস-কেমিক্যাল, যা ফ্যাব্রিক ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে ব্যবহৃত হয়, সেটির দাম এরই মধ্যে বেড়ে গেছে; কাগজের দামও বেড়েছে। সুতরাং যুদ্ধ যত কম দীর্ঘায়িত হয়, ততই সবার জন্য মঙ্গল।
পোশাক কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা ২০-৩০ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার পেছনে জ্বালানি সংকট কোনো ভূমিকা রেখেছে কি?
উৎপাদন সক্ষমতা কমার পেছনে জ্বালানি সংকটের আংশিক ভূমিকা আছে। আমাদের আরএমজি খাতের কারখানাগুলো মূলত গ্রিডলাইনের বিদ্যুতে চলে। আরইবি, ডেসা বা ডেসকোর লাইন ছাড়াও কিছু ভার্টিক্যাল ফ্যাক্টরির নিজস্ব ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্ট আছে। গ্রিডলাইনে যখন লোডশেডিং হয়, তখন আমরা স্ট্যান্ডবাই জেনারেটর চালাই, যা ডিজেল দিয়ে চলে। এ সংকট তৈরি হওয়ার আগ পর্যন্ত ডিজেল সরবরাহ নিয়ে কোনো চ্যালেঞ্জ ছিল না, তবে দাম নিয়ে সমস্যা ছিল।
ডিজেল জেনারেটরে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হয় ৩০-৩৫ টাকা, যেখানে গ্রিডলাইনে খরচ হয় মাত্র ১০-১৩ টাকা। আমরা এ পরিস্থিতির সঙ্গে কোনোমতে মানিয়ে নিচ্ছিলাম, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য সংকটের পর ডিজেল পাওয়াটাও কঠিন হয়ে গেছে। ডিজেল পেলেও অনেক সময় ব্যয় করতে হচ্ছে, আর না পেলে টোটাল প্রোডাকশন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। একদিকে লোডশেডিং, অন্যদিকে স্ট্যান্ডবাই জেনারেটর চালাতে না পারা—এ দুই কারণেই আমাদের ২০-২৫ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে। এটি প্রাথমিক ধারণা; প্রতিষ্ঠানভেদে এটি ১০ বা ৩০ শতাংশও হতে পারে।
এ বছর যেহেতু বৈশ্বিক একটা প্রেক্ষাপট আছে, আপনার কি মনে হয় আসন্ন বাজেটে উৎসে কর কমানো জরুরি বেশি, না জ্বালানিতে ভর্তুকি কমানো বেশি জরুরি? বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশা কী?
বাজেট নিয়ে এনবিআরের সঙ্গে আমাদের সম্ভবত ২৬ তারিখে মিটিং আছে। আমরা বাজেটে কী চাই, তা এরই মধ্যে গুছিয়ে এনবিআরকে জমা দিয়েছি। জ্বালানির বিষয়ে আমরা মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে মিটিং করেছি। জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে বলেছি, প্রতি বছর যে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়, সেই দায়ভার তো মূলত আপনাদের কাঁধেই আসে। আমাদের প্রস্তাব হলো জ্বালানি আমদানি থেকে শুরু করে রিগ্যাস্টিফিকেশন হয়ে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত যত ধরনের ট্যারিফ, ডিউটি, ভ্যাট ও এআইটি আছে, সেগুলো আপনারা কেন নেবেন? অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এলএনজির ওপর থেকে কিছু প্রত্যাহার করা হয়েছিল, কিন্তু ভোক্তা পর্যায়ে এখনো অনেক রয়ে গেছে। যে জিনিস আপনি উৎপাদন করেন না, তাতে ট্যাক্স বা ডিউটির এতগুলো স্তর থাকার কোনো কারণ নেই।
একদিকে আপনারা বলছেন ভর্তুকি দিচ্ছেন, আবার অন্যদিকে ডিউটি নিচ্ছেন। মন্ত্রণালয় বিষয়টি আমলে নিয়েছে এবং তারা অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলবে। প্রয়োজনীয়তার কথা বললে আমি অবশ্যই সবার আগে জ্বালানি নিরাপত্তার কথা বলব। আর উৎসে কর নিয়ে আমরা খুব বিশাল কোনো ছাড় চাইনি, আমরা চাই এটি যেন একটি সহনীয় পর্যায়ে থাকে। কারণ সরকারেরও রাজস্ব দরকার, আবার আমাদেরও বেঁচে থাকতে হবে। উৎসে কর কমানোর পক্ষে আমরা আমাদের যৌক্তিক ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছি।
আসন্ন বাজেটে করের বোঝা বাড়তে পারে বলে নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে জানা যাচ্ছে। এর প্রভাবে পরিস্থিতি কেমন হতে পারে?
আমাদের খাতে করের বোঝা বাড়ানোর কোনো সুযোগ এখন নেই। এমনিতেই অনেক ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের দাবি, যে উৎসে করটা নেয়া হয়, সেটাই যেন চূড়ান্ত বা ‘ফুল অ্যান্ড ফাইনাল সেটলমেন্ট’ হিসেবে গণ্য করা হয়। সাধারণত টার্নওভার বা এফওবির ওপর ১ শতাংশ উৎসে কর নেয়া হয়। ১০০ ডলারের পণ্য বিক্রি করলে ১ ডলার কর নেয়াটা দেখতে খুব সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু আসলে তা নয়। আমাদের যদি ৫ শতাংশ নিট প্রফিট হয়, তবে সেই ৫ ডলার থেকে ১ ডলার কর নিয়ে নেয়া মানে হলো আপনি নিট মুনাফার ওপর ২০ শতাংশ ট্যাক্স নিচ্ছেন।
আমাদের গার্মেন্টস সেক্টরে ৫-৭ শতাংশ নিট মুনাফা করতে পারলেই যে কেউ খুশি থাকে, কারণ আমরা মূলত ভলিউমে ব্যবসা করি। তাই ১ শতাংশ উৎসে কর মানেই হলো নিট মুনাফার ২০ শতাংশ ট্যাক্স। আমরা এনবিআরকে এটাই ব্যাখ্যা করব যে আপনারা যদি ২০ শতাংশ ট্যাক্স নেন, তবে সেই অনুযায়ী সার্ভিসও দিতে হবে। সার্ভিস বলতে আমরা ভালো ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা অবকাঠামো বুঝি। কিন্তু দুর্বল অবকাঠামো আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে আমাদের ব্যবসার খরচ বাড়ছে এবং ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ব্যবসা যত কঠিন হবে, খরচ তত বাড়বে—এ বিষয়টিই আমরা বিস্তারিত তুলে ধরব।
নতুন প্রজন্ম আরএমজি খাতে খুব একটা আগ্রহী না। এমনকি শিল্পের পথিকৃৎদের দ্বিতীয় প্রজন্ম যারা এরই মধ্যে পোশাক খাতে এসেছে, তারাও মনে করছে সরে যেতে পারলে মনে হয় ভালো হতো। এ পরিস্থিতিটা আগামীতে বড় ধরনের ক্রাইসিস তৈরি করতে পারে কিনা?
নতুন প্রজন্মের মধ্যে যদি এমন মানসিকতা তৈরি হয় এবং আমাদের সম্পর্কে সুশীল সমাজ বা সরকারের কিছু আমলাদের নেতিবাচক ধারণা অব্যাহত থাকে, তবে পরিস্থিতি আস্তে আস্তে খারাপের দিকেই যাবে। আমরা যারা ফার্স্ট জেনারেশনের শেষের দিকে ছিলাম, আমাদের পড়াশোনা শেষ করার পর খুব বেশি বিকল্প ছিল না; হয় চাকরি করতে হতো, না হয় ব্যবসা বা ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে সফল হতে হতো। কিন্তু আমাদের নেক্সট জেনারেশনের সামনে অনেক অপশন আছে। তাদের একটা শক্ত আর্থিক ভিত্তি বা ফাউন্ডেশন এরই মধ্যে তৈরি হয়ে আছে। এখন যে ব্যবসা করে নিগৃহীত হতে হয়, যেখানে মার্জিন খুব স্লিম এবং কাঙ্ক্ষিত সম্মান পাওয়া যায় না, সেই ব্যবসায় তারা কেন আসবে? আমরা নতুন প্রজন্মকে মোটিভেট করার চেষ্টা করছি যেন তারা শুধু এ ব্যবসায় আটকে না থেকে বহুমুখীকরণ করার চেষ্টা করে।
বর্তমানে যেভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে, এভাবে চলতে থাকলে পোশাক খাত আর কয় বছর বাংলাদেশে টিকবে বলে আপনি মনে করেন?
টিকবে আরো অনেক বছর। পোশাক খাত বাংলাদেশে আরো ২০-২৫ বছর নিশ্চিতভাবেই টিকবে, তবে বর্তমান স্কেলে নয়। দিন দিন আমাদের ভ্যালু এডিশন ও রিটেনশন বাড়াতে হবে। আমরা যে লো-অ্যান্ড বা লোয়ার-মিড সেগমেন্টে কাজ করছি, এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
পোশাক খাতে শুরুর দিককার সময় ভারত ও শ্রীলংকার কর্মীদের ওপর নির্ভরতা ছিল। বর্তমান চিত্র কী? আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কি আসলে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারছে পোশাক খাতের জন্য?
বিদেশী কর্মকর্তাদের ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা দিন দিন কমছে। এক সময় বাংলাদেশে বিদেশী কোম্পানিগুলোর কান্ট্রি ম্যানেজার বা কান্ট্রি ডিরেক্টর পদে প্রায় সবাই বিদেশী ছিলেন, কিন্তু এখন আমাদের দেশী ছেলে-মেয়েরাই সেসব পদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কেউ কেউ হয়তো এখনো মার্কেটিংয়ের প্রয়োজনে শ্রীলংকান বা ইন্ডিয়ান কর্মী রাখেন, তবে আমি মনে করি এখন আর তার কোনো প্রয়োজন নেই। লেখাপড়ার বিষয়ে বলতে গেলে, একটা সময় আমাদের দেশে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং বা ফ্যাশন টেকনোলজি নিয়ে পড়ার সুযোগ ছিল না। কিন্তু এখন প্রচুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ার তৈরি হচ্ছে। এর বাইরে ট্র্যাডিশনাল লেখাপড়া শেষ করেও অনেকে এ সেক্টরে ভালো করছেন।
এখন পোশাক কারখানায় রোবোটিক্স এসেছে, অটোমেশন এসেছে। এর ফলে শ্রমিক বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ওপর কী প্রভাব পড়ছে?
প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সোয়েটার খাতে একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে সোয়েটার ম্যানুয়ালি তৈরি হতো, এখন সবই কম্পিউটার বা পিএলসি নিয়ন্ত্রিত জ্যাকার্ড মেশিনে হয়। এখন একজন মানুষ অন্তত তিনটি মেশিন পরিচালনা করতে পারেন, যেখানে চীন বা অন্যান্য দেশে চার-পাঁচটি মেশিনও চালায়। এর ফলে জনবলের ওপর একটা ইমপ্যাক্ট বা প্রভাব তো পড়েছেই, কিন্তু একই সঙ্গে কাজের পরিবেশে কমফোর্ট বা স্বস্তি এসেছে। আগে হাতে টেনে সোয়েটার বোনা ছিল অমানবিক পরিশ্রমের কাজ। এখন অত্যাধুনিক মেশিনগুলো এসি রুমে রাখতে হয়, ফলে কর্মীরাও খুব আরামদায়ক পরিবেশে কাজ করতে পারেন।
মজুরি যেহেতু এখন একটি ভালো পর্যায়ে যাচ্ছে, তাই পুরুষরাও এ খাতে কাজ করতে আগের চেয়ে বেশি আগ্রহী হচ্ছে। শতাংশের হিসাবে হয়তো নারী শ্রমিকের সংখ্যা কিছুটা কমছে, তবে বাস্তব চিত্র হলো—ছেলেরা এখন মনে করছে এ সেক্টরে কাজ করে সংসার চালানো বা সারভাইভ করা সম্ভব। তাই দুই প্রান্তেই পরিবর্তন আসছে। প্রযুক্তি আমাদের ব্যবহার করতেই হবে, তবে পাশাপাশি দক্ষ মানুষেরও প্রয়োজন থাকবে। বিশ্বব্যাপী শিল্প বিপ্লবের ধারায় পোশাক শিল্প যে পৃথিবীর উন্নত দেশ থেকে এখন বাংলাদেশে এসেছে, এমনটা সব জায়গাতেই হয়েছে।
গ্রিন ফ্যাক্টরির তালিকায় বিশ্বে বাংলাদেশ শীর্ষে অবস্থান করছে। কিন্তু এ গ্রিন ফ্যাক্টরিগুলো কি ব্যবসায়িকভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক বা টেকসই করতে পারছে?
শুরুতে আমাদের ধারণা ছিল যে গ্রিন ফ্যাক্টরি করলে হয়তো আমরা পণ্যের বাড়তি মূল্য পাব। কিন্তু পরে দেখা গেল বাড়তি মূল্য পাওয়া যাবে না। তবুও এ উদ্যোগ বন্ধ হয়নি; কারণ গ্রিন ফ্যাক্টরি থাকলে বায়ারদের কাছে অগ্রাধিকার পাওয়া যায়। যদি গ্রিন ফ্যাক্টরির ক্ষেত্রে মূল্য বেশি পেতাম, তাহলে ভালো হতো। তবে এক্ষেত্রে বিনিয়োগের একটা সীমারেখা থাকা উচিত। অহেতুক খরচ বৃদ্ধি করে ফ্যাক্টরিকে শুরুতেই দুর্বল করার কোনো কারণ নেই।
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ নিয়ে কথা হচ্ছে। উত্তরণের সময়সীমা যদি পেছানোও হয়, তবে সেই বাড়তি সময়ের মধ্যে আমাদের বিজনেস কমিউনিটি কি প্রস্তুত হতে পারবে?
এটা কেবল বিজনেস কমিউনিটির ইস্যু না, মূলত সরকারের ইস্যু। আমরা বাড়তি যে তিন বছর সময় চাচ্ছি, সেই সময়টা মূলত কাজে লাগাতে হবে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা বা নেগোসিয়েশনে। এফটিএ, পিটিএ বা ইপিএ, যা এরই মধ্যে জাপানের সঙ্গে হয়েছে। আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি করা। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আমাদের ডিসিপিএস নামে একটা ট্রেড স্কিম আছে, খুব ভালো। অন্য আরো দেশের সঙ্গেও আমাদের এফটিএ করতে হবে। এছাড়া চ্যালেঞ্জ হলো অবকাঠামোগত। এজন্য সময় প্রয়োজন। এছাড়া আমাদের জ্বালানি সমস্যাও আছে। প্রস্তুতি যথেষ্ট নেই, এটা প্রমাণিত। এখন সময়টা কাজে লাগাতে হবে অবকাঠামো উন্নয়নে আর দ্বিপক্ষীয় নেগোসিয়েশনে। এবারের পর আর বলার সুযোগ নেই যে আবার পেছাতে হবে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কোন বিষয়গুলো নতুন সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
জ্বালানি সমস্যার সমাধান করতে হবে। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট না হলেও আমরা সমস্যার মধ্যেই ছিলাম, বিশেষ করে গ্যাস পরিস্থিতি নিয়ে। আরেকটি হলো ব্যাংকগুলোর লেন্ডিং রেট যেন কমে আসে, সেজন্য লো কস্ট ফান্ড দিতে হবে। চাইলেই ব্যাংকগুলো সুদহার কমাতে পারবে না। কারণ ব্যাংকের বরোয়িং কস্ট যেটা আছে, সেটার ওপর মার্জিনের পর তাদের লেন্ডিং। ফলে কম খরচের অর্থায়ন দিতে হবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হয়। সেটা সরকারকেই দিতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে, যেটা হবে রিফাইন্যান্স স্কিম। ব্যাংকগুলো লস করে ব্যবসা করবে না। এ দুই জায়গায় ফোকাস করতে হবে।
সূত্র: বণিক বার্তা

