বাংলাদেশের শিল্পোন্নয়ন শুরু থেকেই মূলত শ্রমনির্ভর উৎপাদন কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তৈরি পোশাক শিল্প (আরএমজি), অন্যান্য উৎপাদন খাত, নির্মাণ, কৃষি এবং বিস্তৃত অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি—সব মিলিয়ে এই মডেল দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। এই কাঠামো যেমন বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, তেমনি রপ্তানি আয় ধরে রেখে বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করেছে।
শুধু তৈরি পোশাক খাতেই প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কাজ করছেন। জাতীয় রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই একটি খাত থেকে। জিডিপিতে এর সরাসরি অবদান প্রায় ১১ থেকে ১২ শতাংশ হলেও, বাণিজ্য ও সেবা খাতের সঙ্গে এর সংযোগের কারণে প্রকৃত প্রভাব আরও বিস্তৃত। তবে এই শক্তিশালী অবস্থানের পাশাপাশি একটি বড় কাঠামোগত ঝুঁকিও রয়েছে—বৈদেশিক বাজারের ওঠানামার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা।
আরএমজির বাইরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তানির্ভর উৎপাদন খাত ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। তবে এই খাতজুড়ে উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতার মান একরকম নয়। একই সঙ্গে দেশের শ্রমবাজার এখনো অনেকাংশে প্রথাগত কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। শ্রমশক্তির বড় একটি অংশ এখনো কম উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত।
এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ কৃষি খাত। মোট শ্রমশক্তির প্রায় দুই-পঞ্চমাংশ এই খাতে কাজ করলেও, জাতীয় জিডিপিতে এর অবদান মাত্র ১১ থেকে ১৪ শতাংশের মধ্যে সীমিত। অর্থাৎ শ্রম কোথায় যাচ্ছে এবং সেখানে কতটা মূল্য সৃষ্টি হচ্ছে—এই অমিল বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। ফলে বলা যায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অগ্রগতি থাকলেও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে পিছিয়ে রয়েছে দেশ।
এদিকে বৈশ্বিক শিল্প ব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। স্বয়ংক্রিয়তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং এখন উৎপাদন ও সেবার ধরন বদলে দিচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—কীভাবে কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন একটি প্রযুক্তি, যা মানুষের মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ভাষা বিশ্লেষণ, প্যাটার্ন শনাক্তকরণ এবং সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম। সেন্সর ও ডেটা বিশ্লেষণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এটি যে নতুন উৎপাদন ব্যবস্থা তৈরি করছে, সেটিই স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং নামে পরিচিত।
প্রচলিত কারখানায় মেশিন নির্ধারিত কাজ করে। স্বয়ংক্রিয় কারখানায় মেশিন পূর্বনির্ধারিত নির্দেশনা অনুসরণ করে। কিন্তু স্মার্ট কারখানায় মেশিন একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, ডেটা বিশ্লেষণ করে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে উন্নত করতে পারে। ফলে উৎপাদন ব্যবস্থা ধীরে ধীরে যন্ত্রকেন্দ্রিকতা থেকে ডেটাকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় রূপ নিচ্ছে।
এই পরিবর্তন দক্ষতা বাড়ালেও বাংলাদেশের শ্রমবাজারে একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশের কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই বা সীমিত শিক্ষা রয়েছে। এদের বড় অংশ পুনরাবৃত্তিমূলক ও নিয়মভিত্তিক কাজে যুক্ত—যেগুলো স্বয়ংক্রিয়তার কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
অন্যদিকে উচ্চশিক্ষিত শ্রমশক্তি, যা মোটের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ, তারা তুলনামূলকভাবে প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, অর্থনীতি ও উন্নত উৎপাদন খাতে কাজ করছে। যথাযথ নীতি না থাকলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির আগেই শ্রমবাজারে বড় ধরনের স্থানচ্যুতি তৈরি করতে পারে।
তবে স্বয়ংক্রিয়তা শুধু কর্মসংস্থান কমায় না, বরং কাজের ধরনও পরিবর্তন করে। সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অনেক রুটিন কাজ রূপ নিতে পারে যন্ত্র পরিচালনা, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণাবেক্ষণ, লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা এবং ডেটা বিশ্লেষণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে। সীমিত শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেও শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শ্রমিকরা ডিজিটাল ও এআই দক্ষতা অর্জন করতে পারেন। যেসব কাজ প্রযুক্তিনির্ভর নয়, সেখানে এখনো মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ অপরিহার্য—বিশেষ করে আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও সেবা খাতে।
এই পরিবর্তনের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মৌলিক এআই ও ডেটা সাক্ষরতা বাধ্যতামূলক করা, প্রকৌশল ও কারিগরি শিক্ষায় প্রযুক্তিনির্ভর কোর্স বাড়ানো এবং স্কুল পর্যায়ে প্রাথমিক প্রযুক্তি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, উন্নত এআই প্রযুক্তিও এখনো মানুষের কিছু মৌলিক সক্ষমতার বিকল্প হতে পারেনি। সৃজনশীলতা, নৈতিক সিদ্ধান্ত, নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতাভিত্তিক জ্ঞান এবং জটিল সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এখনো মানুষের শক্তির কেন্দ্রবিন্দু। এই কারণে ভবিষ্যতের কর্মবাজার হবে মানব ও প্রযুক্তির সমন্বিত কাঠামো। বাংলাদেশকে সেই বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে মুখস্থনির্ভর এবং তথ্যভিত্তিক। কিন্তু পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারে টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন সমস্যা সমাধান, সমালোচনামূলক চিন্তা, দলগত কাজ এবং আজীবন শেখার সক্ষমতা তৈরি করা।
বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এআই ও স্বয়ংক্রিয়তা ইতোমধ্যে উৎপাদন খাতে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। তবে ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু প্রযুক্তির ওপর নয়, বরং নীতি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনবান্ধব মানসিকতার ওপর। মূল প্রশ্ন তাই একটাই—প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের মানুষ কি নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবে?
সিভি/এম

