পানোস মাইটারোস বাটা গ্রুপের গ্লোবাল প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাটায় যোগ দেওয়ার পর তিনি ‘রিইগনাইট বা বাটাকে বৈশ্বিকভাবে পুনরুজ্জীবিত’ করার কৌশল গ্রহণ করেন। সম্প্রতি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সফর করেন তিনি। এ সময় তিনি বাটার ঐতিহ্য, তাঁর নেতৃত্বের দর্শন, পণ্যের মান, ব্যবসার সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বাংলাদেশের গুরুত্বসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন।
পানোস মাইটারোস: এটি আমার প্রথম বাংলাদেশ সফর। এই সফরে আমি এখানকার বাজার দেখার সুযোগ পেয়েছি। আমার কাছে সবকিছু শুরু হয় ভোক্তা থেকে। তাই বাজারে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছি ভোক্তা কারা, আমরা কাদের উদ্দেশ্যে কাজ করছি এবং তারা কী চায়। আমি মনে করি এখানে দুটি আলাদা বাস্তবতা রয়েছে। একটি হলো বাটার জগৎ, ১৯৬২ সালে বাংলাদেশে বাটার যাত্রা শুরু। যার অনেক গুরুত্ব রয়েছে, তবে সময়ের সঙ্গে পৃথিবী অনেক এগিয়ে গেছে। আমি বিশ্বাস করি বাটা সেই গতির সঙ্গে সমানভাবে এগোতে পারেনি, বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে।
বিষয়টি এমন—হ্যাঁ, বাটা চিনি, কিন্তু বাটার জুতা কেনার কথা কি ভাবছে ভোক্তা? হয়তো না। সব ভোক্তার কথা বলছি না, কিন্তু কিছু ভোক্তা আছে এমন, বাংলাদেশ সম্পর্কে আমার এটাই পর্যবেক্ষণ। বাংলাদেশে আমাদের একটি খুব বিশেষ অবস্থান ছিল যখন আমরা শুরু করেছিলাম। আমরা মানুষের কাছে জুতা পরিচিত করেছি, এমনকি কীভাবে জুতা তৈরি করতে হয়, সেটাও শিখিয়েছি। কিন্তু এখন আমরা এই বাজারে একা নই। আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে। এই অবস্থায় আমরা ভাবছি কীভাবে আরও প্রাসঙ্গিক হতে পারি? কীভাবে আমরা বাটাকে আবার ‘রিইগনাইট বা পুনরুজ্জীবিত’ করতে পারি।
পানোস মাইটারোস: খুব ভালো একটি শব্দ বলেছেন, ‘নষ্ট না করে’। অনেক ব্র্যান্ড আছে, যাদের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তারা সাধারণত দুই ধরনের অবস্থার মুখোমুখি হয়। একটি হলো তারা অতীতেই আটকে থাকে, কারণ, একসময় তারা ভালো ছিল। তারা আধুনিকায়ন করে না এবং ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যায়। অন্যটি হলো অতীতকে অস্বীকার করে বাজার ও প্রতিযোগিতার প্রভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন কেউ হয়ে ওঠার চেষ্টা। আমি বাটার ক্ষেত্রে যা দেখি, তা হলো ঐতিহ্য ও লিগ্যাসির একটি সমন্বয়। এরপর শুরু হয় প্রাসঙ্গিকতার বিষয়টি। এখনকার ভোক্তা, রুচি, ব্র্যান্ড, আজকের চাহিদা। বাটা সব সময় এমন জুতা তৈরি করে যাবে, যেটা অসাধারণভাবে ভালো জুতা এবং তা সবার জন্য সহজলভ্য।
পানোস মাইটারোস: আমাদের মূল বিশ্বাস, আমরা সবার জন্য জুতা তৈরি করতে চাই। সবাই ভালো জুতা পরার অধিকার রাখে আর যখন তারা ভালো জুতা পরার অধিকার রাখে, তখন তারা বাটার জুতা পরবে। এটা শুধু কথার কথা নয়। এটা করতে হলে এমন পণ্য তৈরি করতে হবে, যা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা, বিভিন্ন অর্থনৈতিক স্তর, নিম্ন, মধ্য, উচ্চ—সব ভোক্তার চাহিদা পূরণ করতে পারে। পাশাপাশি মানের ক্ষেত্রে কোনো আপস করা যাবে না।
দাম যা–ই হোক না কেন, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। মানের গণতন্ত্রীকরণ করতে হবে, যা বাটা করেছে। আমরা মানসম্মত পণ্য তৈরি করি এবং তা সবার জন্য সহজলভ্য করি, শুধু উঁচু শ্রেণির জন্য নয়। অন্যদিকে, নকশা হলো এমন একটি বিষয়, যেখানে কিছুটা ব্যক্তিগত পছন্দ কাজ করে। আমাদের সামনে দুটি পথ আছে। একটি হলো বাজারকে অনুসরণ করা। দ্বিতীয়টি, নিজেদের সম্পর্কে খুব পরিষ্কার ধারণা থাকা এবং সেই অনুযায়ী বাজারের কাছে প্রাসঙ্গিক হওয়া।
পানোস মাইটারোস: বাটার ক্ষেত্রে ভালো পণ্য হলো এমন একটি পণ্য, যা ভালোভাবে তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে সেটি যথেষ্ট নয়। আজকের দিনে একটি ভালো পণ্যে আরও যেটা দরকার, সেটা হলো এটি হতে হবে আরও বেশি আরামদায়ক। আমরা এ বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছি। মানুষ এখন আরও বেশি আরাম চায়। বর্তমানে স্নিকার্সের ব্যবহার যে অনেকখানি বেড়েছে, তা শুধু সেগুলো দেখতে সুন্দর তার কারণে নয়, এগুলো বেশির ভাগ সময় বেশি আরামদায়কও। একটি ভালো বাটা পণ্য এমন হতে হবে, যা আরও বিস্তৃত ভোক্তা গোষ্ঠীর জন্য প্রাসঙ্গিক। একটি ভালো পণ্য মূলত এই বিষয়গুলোর সমন্বয়—ভালোভাবে তৈরি, আরামদায়ক ও সময়ের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক।
পানোস মাইটারোস: গত কয়েক বছরে বাটা খুব বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি। আমরা একধরনের স্থবিরতা দেখেছি। এই স্থবিরতার প্রধান কারণ বাটা তার নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আমরা অনেক বেশি নিজেদের ভেতরে তাকিয়ে থেকেছি, বাইরের দিকে তাকানোর বদলে। রিইগনাইট কৌশল আসলে একটি প্রবৃদ্ধির কৌশল। এটা খুব পরিষ্কার যে বাটার মতো একটি ব্র্যান্ড, যা বিশাল ভোক্তা গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়, যদি না বড় হয়, তাহলে তা টিকে থাকতে পারবে না। তাই আমাদের মতো একটি ব্র্যান্ডের জন্য বাজারের বড় অংশীদার হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং সেটাই আমরা করব।
পানোস মাইটারোস: বাংলাদেশ আমাদের কাছে বিভিন্ন কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বাজার। প্রথমত, এটি প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশ। তাই এই বাজারকে উপেক্ষা করা যাবে না। আমরা এখানে ১৯৬২ সাল থেকে আছি এবং আমরা থাকতেই এসেছি। দ্বিতীয়ত, বাটা একটি খুবই অনন্য বৈশ্বিক ব্র্যান্ড, কারণ, এটি একই সঙ্গে খুব স্থানীয়ও। বাংলাদেশ এই স্থানীয়তার একটি খুব ভালো উদাহরণ। এখানে রুচির মধ্যে একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এটি স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে, বিশেষ করে উৎসবভিত্তিক সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ, আমরা এটিকে একটি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে দেখতে চাই। বাংলাদেশে জুতা তৈরি করে তা রপ্তানি করতে চাই আমরা। তাই আমি বলব, এই তিন দিক থেকেই বাংলাদেশ আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বাজার।
পানোস মাইটারোস: বাটাকে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে বিকশিত হতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে আমি দেখতে চাই, ভোক্তাদের কাছে খুব পরিষ্কার ধারণা থাকবে বাটা বলতে কী বোঝায়। এটি জুতা ও স্নিকার্স—দুটির জন্যই, কারণ, এই দুটি আলাদা হবে। আমি দেখতে চাই বাটা আরও বড় হচ্ছে। আমাদের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য হলো ৫০ শতাংশ, যা এই কঠিন বাজারে খানিকটা উচ্চ আকাঙ্ক্ষা, তবে আমি এতে গভীরভাবে বিশ্বাস করি। বাটা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হোক ভোক্তাদের সংস্কৃতি ও ট্রেন্ডের সঙ্গে। তার চেয়েও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমি চাই বাটা সবার জন্য সর্বত্র সহজলভ্য হোক।
পানোস মাইটারোস: আসলে আমার একটি খুব সহজ বার্তা আছে, তা হলো ‘অসাধারণভাবে ভালো জুতা’। এভাবে মানুষ বাটাকে মনে রাখুক, এটাই আমার প্রত্যাশা। সূত্র: প্রথম আলো
সিভি/এম

