টাকা ছাপানো বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মিত কাজের অংশ। তবে অর্থনীতির মৌলিক সূত্র মেনেই বাংলাদেশ ব্যাংক এই কাজটি করে থাকে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা ছাপানোর কৌশল এবং অর্থনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে কথা বলেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ, গবেষক এবং বর্তমানে ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এর নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে. মুজেরী।
প্রশ্ন: বাংলাদেশ ব্যাংক কেন টাকা ছাপায়? চাইলেই কি বাংলাদেশ ব্যাংক ইচ্ছামতো টাকা ছাপাতে পারে?
মুস্তফা কে মুজেরী: আসলে প্রয়োজন হলেই টাকা ছাপানো হয়, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইলেই ইচ্ছামতো টাকা ছাপাতে পারে না। মূলত দুটি কারণে টাকা ছাপানো হয়। প্রথমত, বাজারে টাকার চাহিদা বাড়লে এবং দ্বিতীয়ত, পুরোনো বা ব্যবহারের ফলে নষ্ট হয়ে যাওয়া নোটগুলো প্রতিস্থাপনের জন্য। কারণ নোটের একটি নির্দিষ্ট আয়ু বা ‘লাইফ’ থাকে, যা ব্যবহারের ফলে একসময় শেষ হয়ে যায়।
প্রশ্ন: টাকা ছাপানোর ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম বা সূত্র কি আছে?
মুস্তফা কে মুজেরী: হ্যাঁ, টাকা ছাপানোর একটি সুনির্দিষ্ট সূত্র রয়েছে। যেমন, যদি ১০০ টাকা ছাপাতে হয়, তবে তার বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ রিজার্ভ থাকতে হয়। এই রিজার্ভের পরিমাণ সাধারণত ১০, ২০ বা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এই ব্যাকআপ হিসেবে সোনা বা বৈদেশিক মুদ্রা রাখা হয়। ফলে অতিরিক্ত টাকা ছাপতে হলে সমপরিমাণ রিজার্ভও নিশ্চিত করতে হয়।
প্রশ্ন: যদি সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনের চেয়ে বেশি টাকা ছাপায়, তবে তার প্রভাব কী হতে পারে?
মুস্তফা কে মুজেরী: অতিরিক্ত টাকা ছাপালে অর্থনীতিতে তার নেতিবাচক বা কুপ্রভাব পড়ে। এর ফলে বাজারে টাকার সরবরাহ বেড়ে যায় এবং মুদ্রাস্ফীতি বা মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে জিনিসের দাম বেড়ে যায় এবং বিশ্ববাজারে দেশীয় টাকার মান কমে যায়। এটি সামগ্রিকভাবে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নষ্ট করে এবং অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে। অর্থনীতিতে যে দীর্ঘদিন ধরে একধরনের অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবল থেকে বের হতে পারছে না, এর পেছনে বিগত সরকারগুলোর প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা ছাপানোও অন্যতম কারণ।
প্রশ্ন: সম্প্রতি দেখা গেছে, সরকার ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিতে টাকা ছাপাচ্ছে, একে আপনি কীভাবে দেখছেন?
মুস্তফা কে মুজেরী: সরকার যখন ঋণ গ্রহণ করে ব্যয় করে, তখন সেই টাকা আবার সার্কুলেশনে চলে আসে। বাজারে টাকার পরিমাণ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়। আগের সরকারগুলোর বেশি বেশি ঋণ গ্রহণের ফলে বর্তমানে একধরনের অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। সরকার যখন রাজস্ব থেকে পর্যাপ্ত আয় করতে পারে না, তখন দৈনন্দিন খরচ, বেতন-ভাতা বা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু অতিরিক্ত ঋণ নিলে সরকার ঋণের ফাঁদে পড়ে যেতে পারে এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে যায়।
প্রশ্ন: এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী?
মুস্তফা কে মুজেরী: প্রথমত, সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে সেই ব্যয় উৎপাদন বা প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হয়। দ্বিতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা। আমাদের দেশে রাজস্ব আদায়ের হার অত্যন্ত কম, যা ৭ শতাংশের নিচে। এটি বাড়ানোর অনেক সুযোগ আছে। এর জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে এবং সঠিক প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে, যাতে সরকারকে ঋণের ওপর কম নির্ভর করতে হয়।
সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে এই ব্যয় দেশের উৎপাদন এবং প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হয়। ব্যয় যদি উৎপাদনশীল খাতে হয়, তবে তা পরোক্ষভাবে রাজস্ব বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। রাজস্ব আদায়ের বর্তমান ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে আরও বেশি রাজস্ব আহরণের যে সুযোগ রয়েছে, তা কাজে লাগাতে প্রয়োজনীয় সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারের দৈনন্দিন খরচ, বেতন-ভাতা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য রাজস্ব আয় বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে ব্যাংক থেকে বা বিদেশি উৎস থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমে আসে। অর্থনীতির বর্তমান অস্থিতিশীলতা কাটানোর জন্য ইচ্ছামতো টাকা না ছাপিয়ে রাজস্ব আদায়ের হার বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। সূত্র: খবরের কাগজ
সিভি/এম

