দীর্ঘ আট মাসের টানা পতনের পর অবশেষে ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস দিয়েছে দেশের রপ্তানি খাত। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে রপ্তানি আয় ৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, তৈরি পোশাক খাতে শিপমেন্ট বেড়ে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা চাহিদা ফিরে আসার কারণেই এই প্রবৃদ্ধি এসেছে।
আজ রোববার প্রকাশিত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এপ্রিল মাসে দেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় ৩৩ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে রপ্তানি আয় ছিল ৩০১ কোটি ডলার।
মাসভিত্তিক হিসাবেও এপ্রিলের চিত্র ইতিবাচক। মার্চ মাসে রপ্তানি আয় ছিল ৩৪৮ কোটি ডলার। সেই তুলনায় এপ্রিলে আয় বেড়েছে ১৫ দশমিক ২০ শতাংশ।
রপ্তানি খাতের এই উল্লম্ফনের পেছনে তৈরি পোশাক শিল্প বড় ভূমিকা রেখেছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, শুধু এপ্রিলেই পোশাক খাত থেকে আয় হয়েছে ৩১৪ কোটি ডলার। যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩১ দশমিক ২১ শতাংশ বেশি। গত বছরের এপ্রিল মাসে এ খাতের আয় ছিল ২৩৯ কোটি ডলার। এ সময় নিট পোশাক রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৩২ শতাংশ।
তবে এই প্রবৃদ্ধিকে স্থায়ী ইতিবাচক ধারা হিসেবে দেখছেন না খাতসংশ্লিষ্টরা। নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ ও এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, মার্চ মাসে ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটির কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন ও শিপমেন্ট ব্যাহত হয়েছিল।
ফলে ওই সময় যেসব চালান পাঠানো সম্ভব হয়নি, সেগুলোর বড় অংশ এপ্রিল মাসে রপ্তানি করা হয়েছে। এতে এক মাসে প্রবৃদ্ধি বেশি দেখা যাচ্ছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাজারে নতুন করে বড় অর্ডার আসেনি কিংবা বিদেশি ক্রেতাদের চাপও বাড়েনি। তাই বর্তমান প্রবৃদ্ধিকে বাস্তব পরিস্থিতির পূর্ণ প্রতিফলন হিসেবে দেখার সুযোগ কম।
তিনি আরও জানান, চলতি মাসের শেষ দিকে আবারও দীর্ঘ ছুটি থাকায় উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পারে। ফলে মে ও জুন মাসেও রপ্তানিতে ওঠানামা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে অন্তত জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন তিনি।
ইপিবির তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুতে জুলাই মাসে প্রায় ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। এরপর টানা আট মাস রপ্তানি আয় কমতে থাকে। সেই ধারাবাহিক পতন ভেঙে এপ্রিলের প্রবৃদ্ধি রপ্তানিকারকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়েছে।
শুধু তৈরি পোশাক নয়, অন্যান্য রপ্তানি খাতেও ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। এপ্রিল মাসে কৃষিপণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি আয়ও বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিভিন্ন খাতের এই সম্মিলিত প্রবৃদ্ধিই সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের উত্থানে ভূমিকা রেখেছে।
তবে সামগ্রিক চিত্র এখনও পুরোপুরি আশাব্যঞ্জক নয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ৩ হাজার ৯৩৯ কোটি ডলার। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ০২ শতাংশ কম। গত অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ৪ হাজার ২০ কোটি ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এক মাসের প্রবৃদ্ধি সাময়িক স্বস্তি দিলেও স্থায়ী পুনরুদ্ধারের জন্য বৈশ্বিক বাজারে স্থিতিশীল চাহিদা, নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকা জরুরি। এখন দেখার বিষয়, এপ্রিলের এই ইতিবাচক ধারা আগামী মাসগুলোতেও ধরে রাখা সম্ভব হয় কি না।

