বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রাজস্ব আদায় দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় দুর্বল জায়গা। উন্নয়ন ব্যয়, ভর্তুকি, ঋণের সুদ পরিশোধ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরকারের ব্যয় বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় রাজস্ব আয় বাড়ছে না। ফলে বাজেট ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হচ্ছে, আর সরকারকে বেশি করে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংস্কার নিয়ে গত বছর বড় ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজস্ব খাত সংস্কার বিশেষ গুরুত্ব পায়। সেই ধারাবাহিকতায় “রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ ২০২৫” জারি করা হয় ১২ মে এবং পরে ১ সেপ্টেম্বর তা সংশোধন করা হয়। কিন্তু নতুন বিএনপি সরকারের অধীনে এই সংস্কারের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। কারণ সংসদের প্রথম অধিবেশন ১২ মার্চ বসার পর সাংবিধানিকভাবে নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে অধ্যাদেশটি অনুমোদন পায়নি।
এই অধ্যাদেশের মূল উদ্দেশ্য ছিল করনীতি প্রণয়ন ও কর প্রশাসনকে আলাদা করা। সহজভাবে বললে, একই প্রতিষ্ঠান যেন একদিকে করনীতি তৈরি করে এবং অন্যদিকে সেই নীতি বাস্তবায়ন করে—এই দ্বৈত ভূমিকা থেকে বের হয়ে আসাই ছিল সংস্কারের লক্ষ্য। এতে নীতিনির্ধারণ আরও স্বচ্ছ, গবেষণাভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক হতে পারত। পাশাপাশি কর আদায় ব্যবস্থায় জবাবদিহি ও দক্ষতা বাড়ার সুযোগ তৈরি হতো।
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত সাত শতাংশের নিচে ঘোরাফেরা করছে, যা বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় খুবই কম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল। এ কারণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক, ব্যবসায়ী মহল, অর্থনীতিবিদ ও নীতি বিশ্লেষকেরা বহুদিন ধরেই রাজস্ব কাঠামোতে বড় ধরনের সংস্কারের কথা বলছেন।
তবে অধ্যাদেশটি তৈরি ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু থেকেই বিতর্কের মুখে পড়ে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাঠামো পরিবর্তন এবং শীর্ষ পদ ভাগাভাগির বিষয়ে আপত্তি জানান। দেশজুড়ে বিক্ষোভও হয়। পরে অধ্যাদেশ সংশোধন করা হলেও প্রশাসনিক টানাপোড়েন এবং এক প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তার রিট আবেদনের কারণে এটি কার্যকর করা যায়নি।
বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সরকার আরও পর্যালোচনার পর রাজস্ব নীতি ও প্রশাসনের পৃথকীকরণ সম্পন্ন করবে। তিনি আগের অধ্যাদেশকে অপরিপক্ব বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু নতুন করে কী ধরনের কার্যকর সংস্কার আসবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়। গত সপ্তাহে অধ্যাদেশ ও সংশোধনী পুনঃপরীক্ষার জন্য নয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সমস্যা হলো, সময় যত যাচ্ছে, অর্থনৈতিক চাপ তত বাড়ছে। রাজস্ব সংস্কার শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি সরাসরি রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। রাজস্ব আয় কম হলে সরকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, জনসেবা সম্প্রসারণ, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালাতে সমস্যায় পড়ে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি, যা পরে ৫৫০ কোটি ডলারে সংশোধিত হয়, সেটির শেষ কিস্তি নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা আলোচনায় এসেছে। কিছু গণমাধ্যমে সংস্কার অনিশ্চয়তার কারণে ঋণ স্থগিতের খবর প্রকাশিত হলেও সরকার তা অস্বীকার করেছে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—যদি বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার বারবার ঝুলে যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অস্থিরতার চাপ। ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা এবং ব্যয়বহুল তাৎক্ষণিক বাজারের ওপর নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশ প্রায় ২০০ কোটি ডলার অতিরিক্ত চাপে পড়েছে। একই সময়ে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব প্রশাসনের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যাংক ঋণ ও বৈদেশিক ঋণের দিকে বেশি ঝুঁকতে হচ্ছে।
দেশীয় ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যেতে পারে। এতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। আবার বিদেশি ঋণ বাড়লে ঋণ পরিশোধের চাপ ভবিষ্যতে আরও ভারী হতে পারে। তাই রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতা শুধু সরকারি হিসাবের সমস্যা নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে।
বর্তমান কর কাঠামোর আরেকটি বড় সমস্যা হলো এর ভিত্তি সংকীর্ণ। অর্থাৎ করদাতার সংখ্যা ও করের আওতা যথেষ্ট বিস্তৃত নয়। রাজস্ব আয়ের বড় অংশ আসে পরোক্ষ কর থেকে, বিশেষ করে ভ্যাটের মতো কর থেকে। এ ধরনের কর সাধারণত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর তুলনামূলক বেশি চাপ তৈরি করে, কারণ তারা আয়ের বড় অংশ ভোগে ব্যয় করে। তাই রাজস্ব সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত করের ভিত্তি বাড়ানো এবং কর ব্যবস্থাকে আরও ন্যায্য করা।
করনীতি ও কর প্রশাসন আলাদা হলে একটি প্রতিষ্ঠান নীতি তৈরি করবে, আরেকটি প্রতিষ্ঠান সেটি বাস্তবায়ন করবে। এতে স্বার্থের সংঘাত কমতে পারে। নীতি প্রণয়ন আরও বিশ্লেষণভিত্তিক হতে পারে। ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ, অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামত নেওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কর আদায়ের ক্ষেত্রে নজরদারি, জবাবদিহি ও দক্ষতা বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।
তবে এটাও সত্য, শুধু প্রতিষ্ঠান আলাদা করলেই রাতারাতি রাজস্ব আয় বেড়ে যাবে না। সংস্কার কার্যকর করতে হলে প্রযুক্তি ব্যবহার, দক্ষ মানবসম্পদ, স্বচ্ছ আইন, করদাতাবান্ধব সেবা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। কিন্তু সংস্কার শুরু না করলে এই পরিবর্তনের পথও তৈরি হবে না।
বাংলাদেশ এখন এমন এক সময় পার করছে, যখন উন্নয়ন ব্যয়ের চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু রাজস্ব আয়ের ভিত্তি দুর্বল রয়ে গেছে। একদিকে ঋণের চাপ, অন্যদিকে বৈশ্বিক অস্থিরতা—এই দুইয়ের মাঝে রাজস্ব খাতকে শক্তিশালী করা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ধরে রাখা কঠিন হবে।
সরকারের উচিত দ্রুত একটি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার রূপরেখা প্রকাশ করা। সেখানে কীভাবে করনীতি ও কর প্রশাসন আলাদা হবে, কোন প্রতিষ্ঠান কী দায়িত্ব পালন করবে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা কী হবে, ব্যবসায়ী ও করদাতাদের জন্য কী সুবিধা আসবে—এসব বিষয় পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে। শুধু কমিটি গঠন করলেই হবে না; নির্দিষ্ট সময়সীমা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনাও থাকতে হবে।
রাজস্ব সংস্কার নিয়ে দেরি মানে শুধু একটি অধ্যাদেশ ঝুলে থাকা নয়। এর অর্থ হলো রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক আস্থা, জনসেবা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন—সবকিছুকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা। তাই প্রশ্ন এখন একটাই: সরকার কি সংস্কারের কঠিন সিদ্ধান্ত নেবে, নাকি বিলম্বের মূল্য আরও বেশি করে দিতে হবে?

