বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই একটি শক্তিশালী ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ার স্বপ্ন নিয়ে এগোচ্ছে। অনলাইন লেনদেন, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স, সরকারি সেবা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, দূরশিক্ষা—সবকিছুর কেন্দ্রে এখন মোবাইল সংযোগ ও ইন্টারনেট। কিন্তু যে খাতটি এই পুরো ডিজিটাল পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি, সেই টেলিযোগাযোগ খাতই বর্তমানে অতিরিক্ত কর ও নীতিগত চাপের মুখে রয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে—একদিকে সরকার যখন ডিজিটাল অর্থনীতিকে জাতীয় অগ্রাধিকারের জায়গায় রাখছে, তখন অন্যদিকে সেই ডিজিটাল অর্থনীতির মূল অবকাঠামোকে কেন এত বেশি করের বোঝা বহন করতে হচ্ছে? ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সামনে রেখে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, টেলিযোগাযোগ এখন আর শুধু কথা বলা বা বার্তা পাঠানোর খাত নয়; এটি অর্থনীতি, শিক্ষা, ব্যবসা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও রাষ্ট্রীয় সেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি অপরিহার্য অবকাঠামো। মূল প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ খাতের রাজস্বের প্রায় ৫৫ শতাংশ কর ও ফি হিসেবে চলে যায়, যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ২২ শতাংশ।
বর্তমান বাস্তবতায় একজন সাধারণ মোবাইল ব্যবহারকারীও উচ্চ করের চাপ অনুভব করেন। মোবাইল সেবার ওপর কার্যকর করের বোঝা প্রায় ৩৯ শতাংশ। এর মধ্যে রয়েছে মূল্য সংযোজন কর, সম্পূরক শুল্ক ও সারচার্জ। নতুন ব্যবহারকারীদের জন্য রয়েছে ৩০০ টাকার সিম কর, যার সঙ্গে আবার প্রযোজ্য মূল্য সংযোজন করও যুক্ত হয়। ফলে একজন নতুন ব্যবহারকারীর জন্য মোবাইল সংযোগ নেওয়াই তুলনামূলক ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।
বাস্তব অর্থে বলা যায়, একজন গ্রাহক মোবাইল সেবায় ১০০ টাকা খরচ করলে তার অর্ধেকেরও বেশি অংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সরকারের ঘরে চলে যায়। এরপর অপারেটরদের হাতে থাকে অবকাঠামো উন্নয়ন, নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, সেবার মান বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের জন্য সীমিত অর্থ। এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে শুধু টেলিযোগাযোগ কোম্পানির সমস্যা নয়; এটি পুরো ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য একটি বড় বাধা।
বাংলাদেশের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজস্ব আহরণের কাঠামোগত দুর্বলতা। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ৭ দশমিক ০ থেকে ৮ দশমিক ০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। অথচ ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো অনেক আঞ্চলিক ও উদীয়মান অর্থনীতিতে এই অনুপাত প্রায় ১৪ থেকে ১৬ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ বাংলাদেশের সমস্যা শুধু করহার কম হওয়া নয়, বরং করের আওতা তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ থাকা।
দেশে এক কোটির বেশি নিবন্ধিত করদাতা থাকলেও সক্রিয়ভাবে রিটার্ন জমা দেন প্রায় ৪০ লাখ। মূল্য সংযোজন কর ব্যবস্থাতেও নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাস্তবে কার্যক্রম চালানো ব্যবসার তুলনায় অনেক কম। এই পরিস্থিতি স্পষ্ট করে যে, একই খাতের ওপর আরও বেশি চাপ না দিয়ে করের আওতা বাড়ানোই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
এখানেই টেলিযোগাযোগ খাতের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়। বেশি মানুষ যদি মোবাইল ও ইন্টারনেট সংযোগের আওতায় আসে, তাহলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও বেশি দৃশ্যমান হবে। মোবাইল আর্থিক সেবা, অনলাইন লেনদেন, ডিজিটাল ব্যবসা, বৈদ্যুতিক চালান ব্যবস্থা এবং অনলাইন বাজারের মাধ্যমে লেনদেনের তথ্য সংরক্ষিত হয়। এতে কর ফাঁকি কমানো সহজ হয়, ব্যবসার হিসাব স্বচ্ছ হয় এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ের সুযোগ বাড়ে।
অর্থাৎ টেলিযোগাযোগ খাত শুধু নিজে কর দেয় না; এটি অন্য খাত থেকেও কর আহরণের পথ তৈরি করে। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পণ্য বিক্রি করেন, একজন গ্রাহক যখন মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করেন, বা একজন উদ্যোক্তা যখন ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করেন—তখন অর্থনীতির লেনদেনগুলো আরও আনুষ্ঠানিক হয়ে ওঠে। এই আনুষ্ঠানিকতা বাড়লে সরকারের করভিত্তি স্বাভাবিকভাবেই বিস্তৃত হয়।
কিন্তু বর্তমান করনীতি অনেক ক্ষেত্রে উল্টো প্রভাব তৈরি করছে। বেশি করের কারণে মোবাইল সেবা ব্যয়বহুল হয়। ব্যয়বহুল হলে নিম্ন আয়ের মানুষ, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এবং প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের জন্য ডিজিটাল সেবায় যুক্ত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি কমে যায়। যারা অনলাইনে আসতে পারতেন, তারা বাইরে থেকে যান। এতে একদিকে অর্থনৈতিক সুযোগ সীমিত হয়, অন্যদিকে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্বও কমে যায়।
তাই এখন দরকার উচ্চ করহারভিত্তিক সংকীর্ণ রাজস্ব মডেল থেকে বেরিয়ে আসা। বাংলাদেশের প্রয়োজন কম করহার, কিন্তু বিস্তৃত করভিত্তির একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি। সম্পূরক শুল্ক যৌক্তিক পর্যায়ে আনা, সিম ইস্যুর ওপর নির্ধারিত কর পুনর্বিবেচনা করা এবং টেলিযোগাযোগ খাতের করপোরেট কর ও ন্যূনতম কর কাঠামো বিনিয়োগবান্ধব করা জরুরি।
টেলিযোগাযোগ খাত মূলধননির্ভর। নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, আধুনিক প্রযুক্তি স্থাপন, গ্রামীণ এলাকায় সংযোগ বাড়ানো এবং সেবার মান উন্নত করতে বড় বিনিয়োগ দরকার। যদি করের চাপ অতিরিক্ত থাকে, তাহলে অপারেটররা প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে পিছিয়ে পড়বে। এর প্রভাব সরাসরি পড়বে গ্রাহকের ওপর—ইন্টারনেটের গতি, কলের মান, নেটওয়ার্ক কভারেজ এবং সেবার খরচে।
নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, টেলিযোগাযোগ খাতকে বিলাসী ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখার সময় শেষ। এটি এখন বিদ্যুৎ, সড়ক, বন্দর বা ব্যাংকিং ব্যবস্থার মতোই জাতীয় উন্নয়নের মৌলিক অবকাঠামো। এই খাত দুর্বল হলে ডিজিটাল অর্থনীতিও দুর্বল হবে। আর ডিজিটাল অর্থনীতি দুর্বল হলে রাজস্ব, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি—সব ক্ষেত্রেই তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
আসন্ন বাজেট তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। সরকার চাইলে এই বাজেটের মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ খাতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ করনীতি গ্রহণ করতে পারে। এতে স্বল্পমেয়াদে কিছু কর ছাড়ের প্রশ্ন উঠলেও মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। কারণ, সংযোগ বাড়লে মানুষ বেশি ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করবে, ব্যবসা বাড়বে, লেনদেন বাড়বে এবং করের আওতাও বিস্তৃত হবে।
এটি রাজস্ব কমানোর আলোচনা নয়; বরং রাজস্ব বাড়ানোর আরও কার্যকর পথ খোঁজার আলোচনা। একই সীমিত খাত থেকে বারবার বেশি কর আদায়ের পরিবর্তে এমন একটি খাতকে শক্তিশালী করা দরকার, যে খাত পুরো অর্থনীতির করভিত্তি বড় করতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। একদিকে আছে স্বল্পমেয়াদি রাজস্ব আদায়ের জন্য টেলিযোগাযোগ খাতের ওপর উচ্চ করচাপ অব্যাহত রাখা। অন্যদিকে আছে করনীতিতে ভারসাম্য এনে মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার সহজ করা, যাতে আরও বেশি মানুষ ডিজিটাল অর্থনীতির অংশ হতে পারে। দ্বিতীয় পথটি শুধু জনগণের জন্য নয়, সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থার জন্যও দীর্ঘমেয়াদে বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ বা স্মার্ট অর্থনীতির লক্ষ্য পূরণ করতে হলে সংযোগকে সস্তা, সহজ ও সবার নাগালের মধ্যে আনতেই হবে। কারণ, আজকের দিনে সংযোগ মানে শুধু মোবাইল সেবা নয়; সংযোগ মানে অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, স্বচ্ছ লেনদেন এবং ভবিষ্যৎ রাজস্ব বৃদ্ধির শক্তিশালী ভিত্তি।

