বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও টেক্সটাইল উপকরণের ওপর ঘোষিত শূন্য শুল্ক সুবিধা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাইতে যাচ্ছেন। বিশেষ করে মার্কিন তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক এই সুবিধার আওতায় কীভাবে আসবে, তা নিয়েই মূলত প্রশ্ন তুলছেন তারা।
মার্চেন্ডাইজ রপ্তানির অন্যতম বৃহৎ খাত তৈরি পোশাক শিল্পের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে শূন্য শুল্ক সুবিধার বিষয়টি থাকলেও এখনো এর বাস্তব সুফল পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানিয়েছেন, এ বিষয়ে মঙ্গলবার ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধিদের (ইউএসটিআর) কাছে সরাসরি ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। তিনি বলেন, “শূন্য শুল্ক সুবিধার বাস্তবায়ন নিয়ে আমরা বিস্তারিত জানতে চাইব।”
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ৫ থেকে ৭ মে পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করবে। এই সফরে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদার করা এবং চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়েই মূল আলোচনা হবে বলে জানিয়েছে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস। চুক্তির ৫.৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিমাণ বাংলাদেশি তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে শূন্য শুল্কে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে। তবে এই পরিমাণ নির্ধারিত হবে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু রপ্তানির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে।
বিজিএমইএ বলছে, চুক্তি থাকলেও এখনো বাংলাদেশ এই সুবিধা ভোগ করতে পারছে না। সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শূন্য শুল্ক সুবিধা এখন তাদের প্রধান আলোচ্য বিষয়। এক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইউএসটিআর প্রতিনিধি দল আজ বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুকিতের সঙ্গেও বৈঠক করবে। সেখানে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি ছাড়াও শ্রম অধিকার, মেধাস্বত্ব ও অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
বর্তমানে ইউএসটিআর ৬০টি দেশের ওপর দুটি আলাদা তদন্ত চালাচ্ছে। এর মধ্যে একটি শিল্প খাতে বাধ্যতামূলক শ্রমের অভিযোগ এবং অন্যটি অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা যা যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে—এই বিষয়গুলো নিয়ে। তবে বিজিএমইএ তাদের অবস্থানপত্রে জানিয়েছে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে এমন কোনো অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা নেই যা যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একই সঙ্গে তারা জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ড অনুসরণ করায় বাধ্যতামূলক শ্রমের অভিযোগও সঠিক নয়।
সংগঠনটি বলেছে, বাজারভিত্তিক অর্থনীতিতে উৎপাদন সবসময় চাহিদা, খরচ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে ওঠানামা করে। তাই “অতিরিক্ত সক্ষমতা” নির্ধারণের জন্য স্পষ্ট মানদণ্ড প্রয়োজন।
বাণিজ্য ঘাটতি ও রপ্তানি চিত্র:
ইউএসটিআর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মোট পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ১১.৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ থেকে আমদানি ছিল ৯.৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩.৩ শতাংশ বেশি।অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে রপ্তানি ছিল ২.৩ বিলিয়ন ডলার। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ৭.১ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ৮৬ শতাংশই তৈরি পোশাক।
বিজিএমইএ জানিয়েছে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প হঠাৎ করে সম্প্রসারিত হয়নি। গত এক দশকে এটি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক চাহিদার ভিত্তিতে বিকশিত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশটি ৩৯.৩ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যা বৈশ্বিক বাজারের প্রায় ৭ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপারেল অ্যান্ড ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ছিল পরিমাণে ১০.৭৩ শতাংশ এবং মূল্যে ১০.৫৩ শতাংশ।
ইউএসটিআরের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় ‘স্পেশাল ৩০১’ পর্যবেক্ষণ তালিকায় নেই। তবে এ বিষয়ে আরও শক্তিশালী প্রয়োগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিবেদনে ২৬টি বাণিজ্য অংশীদারের বিষয়ে মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

