দেশের অর্থনীতিতে ঋণ এখন আর শুধু উন্নয়ন অর্থায়নের একটি মাধ্যম নয়, বরং বাজেট ব্যবস্থাপনার বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগের সরকারগুলোর মতো বর্তমান সরকারও উন্নয়ন প্রকল্প, প্রশাসনিক ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নানা খরচ মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভর করছে। কিন্তু সমস্যা হলো, যে ঋণ একসময় উন্নয়ন ব্যয় চালাতে সাহায্য করেছিল, সেই ঋণের সুদ পরিশোধই এখন বাজেটের বড় অংশ খেয়ে ফেলছে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সম্ভাব্য বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ব্যয়ের মধ্যে শুধু সুদ পরিশোধেই বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকার আগামী অর্থবছরে প্রতি ১০০ টাকা ব্যয় করলে তার প্রায় ১৪ টাকা চলে যাবে পুরোনো ঋণের সুদ শোধ করতে। এই হিসাব দেখলেই বোঝা যায়, ঋণ এখন সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কতটা বড় চাপ তৈরি করেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, মোট বাজেট ব্যয়ের ১৩ দশমিক ৭০ শতাংশই খরচ হবে সুদ পরিশোধে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ বাবদ ব্যয় ধরা হচ্ছে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। আর বৈদেশিক ঋণের সুদ বাবদ ব্যয় ধরা হচ্ছে ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ সুদ ব্যয়ের বড় অংশই আসছে দেশের ভেতর থেকে নেওয়া ঋণ থেকে। কারণ দেশীয় ব্যাংক ব্যবস্থা ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া ঋণের সুদের হার সাধারণত বেশি থাকে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের সরকারি মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮৮ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ১০১ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৮৭ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার। সংখ্যাগুলো শুধু বড় নয়, এগুলো ভবিষ্যৎ বাজেটের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপের ইঙ্গিতও দেয়।
ঋণের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এটি একবার নেওয়া হলে শুধু মূল টাকা ফেরত দিলেই দায় শেষ হয় না। এর সঙ্গে সুদও নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়। সরকার যদি রাজস্ব আয় যথেষ্ট বাড়াতে না পারে, তাহলে পুরোনো ঋণের সুদ শোধ করতেই আবার নতুন ঋণ নিতে হয়। এতে ঋণের ওপর ঋণ জমতে থাকে। এই অবস্থাকে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়, কারণ এতে উন্নয়ন ব্যয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো প্রয়োজনীয় খাতে বরাদ্দ দেওয়ার জায়গা ধীরে ধীরে কমে যায়।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজস্ব আয় কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়েনি। কর আদায়ে দুর্বলতা, করের আওতা সীমিত থাকা, কর ফাঁকি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে মন্দাভাব সরকারের আয় বৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে আছে। কিন্তু অন্যদিকে ব্যয় থেমে নেই। উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ভর্তুকি, ঋণ পরিশোধ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প চালু রাখতে সরকারকে নিয়মিত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান বাড়ছে, আর সেই ঘাটতি পূরণে সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিস্থিতি আরও কঠিন হওয়ার একটি বড় কারণ হলো বিদেশি ঋণে নেওয়া অনেক বড় প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে গেছে। অর্থাৎ এসব ঋণের ক্ষেত্রে যে সময় পর্যন্ত কিস্তি না দিলেও চলত, সেই সময় শেষ হয়েছে। এখন সেসব ঋণের কিস্তি ও সুদ নিয়মিত পরিশোধ করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ডলারের বাজারের অস্থিরতা। ডলারের দাম বাড়লে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়ে। কারণ ডলারে নেওয়া ঋণ পরিশোধ করতে হলে স্থানীয় মুদ্রায় বেশি টাকা ব্যয় করতে হয়।
এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ ঋণের চাপও কম নয়। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালু রাখা এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য সরকার দেশীয় উৎস থেকে ঋণ নিচ্ছে। কিন্তু দেশীয় ঋণের সুদের হার তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এর ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি ঋণ নেওয়া হলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তিও কঠিন হয়ে যেতে পারে। এতে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, বছর শেষে সংশোধিত বাজেটে সুদ ব্যয়ের পরিমাণ শতাংশের হিসাবে আরও দু-তিন শতাংশ বাড়তে পারে। কারণ বাজেট ঘোষণার সময় যে হিসাব ধরা হয়, বাস্তবে অর্থবছরের মাঝামাঝি বা শেষে অনেক সময় ব্যয় বেড়ে যায়। বিশেষ করে সুদের হার, ডলারের দাম, ঋণ পরিশোধের সময়সূচি এবং নতুন ঋণের প্রয়োজনীয়তা বদলে গেলে সুদ ব্যয়ও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ও জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেছেন, সুদ ব্যয় বাড়া মানে সরকারের হাতে অন্য খাতে ব্যয়ের সুযোগ কমে যাওয়া। কারণ বাজেটের একটি বড় অংশ বাধ্যতামূলকভাবে ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যায়। তাঁর মতে, এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে চাপ থাকলেও প্রত্যাশিত বরাদ্দ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এই মন্তব্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সুদ পরিশোধ এমন একটি ব্যয়, যা সরকার চাইলেই সহজে কমাতে পারে না। শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমানো রাজনৈতিকভাবে কষ্টকর হলেও বাস্তবে অনেক সময় সরকার এসব খাতে কাঙ্ক্ষিত বরাদ্দ দিতে পারে না। কিন্তু ঋণের সুদ না দিলে সরকারের আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই সুদ পরিশোধকে অগ্রাধিকার দিতেই হয়। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো তুলনামূলকভাবে চাপে পড়ে।
এর আগের হিসাব দেখলেও সুদ ব্যয়ের চাপ স্পষ্ট হয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শুধু সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছিল ১ লাখ ১৪ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। তখন সংশোধিত বাজেটের মোট আকার ছিল ৭ লাখ ১৪ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে প্রতি ১০০ টাকা ব্যয়ের মধ্যে ১৬ টাকা চলে গিয়েছিল ঋণের সুদ পরিশোধে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের মোট আকার ছিল ৭ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। ওই অর্থবছরে সুদ পরিশোধে ব্যয় করতে হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ সে সময় প্রতি ১০০ টাকা ব্যয়ের মধ্যে ১৭ টাকার বেশি গেছে পুরোনো ঋণের সুদ পরিশোধে। এই তুলনা দেখায়, সুদ ব্যয় এক বছরের সমস্যা নয়; এটি ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকা একটি আর্থিক চাপ।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রতি ১০০ টাকায় প্রায় ১৪ টাকা সুদে যাওয়ার হিসাব আপাতদৃষ্টিতে আগের দুই অর্থবছরের তুলনায় কিছুটা কম মনে হতে পারে। কিন্তু এখানে মনে রাখতে হবে, এটি সম্ভাব্য বাজেটের প্রাথমিক হিসাব। অর্থবছর শেষে বাস্তব ব্যয় বাড়তে পারে। বিশেষ করে ডলারের দাম, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি, অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদের হার এবং বাজেট ঘাটতির ওপর নির্ভর করে সুদ ব্যয়ের আসল চাপ আরও বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, সরকার বড় আকারের ঘাটতি বাজেট করছে। সেই ঘাটতি পূরণে দাতা দেশ ও সংস্থার পাশাপাশি দেশীয় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। এর ফলে সুদ ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। তাঁর মতে, বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা, ডলারের দরের ওঠানামা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি সুদের হারকে উঁচু পর্যায়ে রেখেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
এই বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, সমস্যাটি শুধু ঋণের পরিমাণে নয়; ঋণের ধরন, সুদের হার, মুদ্রাবাজার এবং রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতার সঙ্গেও জড়িত। সরকার যদি কম সুদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নিতে পারে, তাহলে চাপ কিছুটা কমে। কিন্তু উচ্চ সুদে স্বল্পমেয়াদি ঋণ বাড়লে প্রতি বছর বাজেটের বড় অংশ সুদে চলে যায়। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও ঋণের দায় পড়ে।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হবে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি বলেছেন, আগামীতে ঋণ ব্যবস্থাপনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। কম সুদের বৈদেশিক ঋণ, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর মাধ্যমে সুদ ব্যয়ের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে।
তবে বাস্তব চ্যালেঞ্জ হলো, শুধু পরিকল্পনা করলেই হবে না; রাজস্ব আদায়ে কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার। করের আওতা বাড়াতে হবে, কর প্রশাসনকে কার্যকর করতে হবে, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হবে এবং প্রকল্প বাছাইয়ে আরও সতর্ক হতে হবে। যে প্রকল্প অর্থনীতিতে সরাসরি উৎপাদন, কর্মসংস্থান বা আয় বাড়াতে পারে না, সে ধরনের প্রকল্পে ঋণ নিয়ে ব্যয় করলে ভবিষ্যতে সেই ঋণের সুদই বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য ঋণ সবসময় খারাপ নয়। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, বন্দর, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের জন্য ঋণ প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু ঋণের টাকা কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে, সেটিই আসল প্রশ্ন। যদি ঋণ নিয়ে এমন প্রকল্প করা হয় যা অর্থনীতিতে আয় তৈরি করে, তাহলে ঋণ পরিশোধ সহজ হয়। কিন্তু যদি ঋণ অপচয়, দুর্নীতি, অদক্ষতা বা অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে খরচ হয়, তাহলে সুদের চাপ জনগণের ওপরই ফিরে আসে।
বর্তমান পরিস্থিতি তাই সরকারের জন্য একটি সতর্কবার্তা। বাজেট বড় করলেই উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না। আয় না বাড়িয়ে ব্যয় বাড়ালে এবং সেই ব্যয় ঋণের ওপর নির্ভর করলে একসময় বাজেটের বড় অংশ বাধ্যতামূলক খাতে আটকে যায়। তখন সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য যে খাতে বেশি বরাদ্দ দরকার, সেসব খাত প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায় না।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সম্ভাব্য বাজেটে সুদ পরিশোধের জন্য ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের বিষয়টি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। সরকারের মোট ঋণ ১৮৮ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো এবং প্রতি ১০০ টাকা ব্যয়ে প্রায় ১৪ টাকা সুদে চলে যাওয়া দেখাচ্ছে, এখন ঋণ ব্যবস্থাপনা আর শুধু হিসাবের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং জনকল্যাণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
আগামী দিনের বড় প্রশ্ন হলো, সরকার কি রাজস্ব আয় বাড়াতে, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে এবং কম সুদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণের দিকে যেতে পারবে? নাকি পুরোনো ঋণের সুদ শোধ করতে নতুন ঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে? এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে আগামী বাজেট কতটা উন্নয়নমুখী হবে, আর কতটা ঋণের চাপে ভারাক্রান্ত থাকবে।

