বাজেটে শুল্ক ও করের পরিবর্তন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কী প্রভাব ফেলে, তা অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়। তবে বাজেট এলেই নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে—এমন আতঙ্ক বহু মানুষের মধ্যে তৈরি হয়। আসন্ন বাজেট ঘিরেও সেই দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে। কারণ, নিত্যপণ্যের ওপর উৎসে কর দ্বিগুণ করার একটি পরিকল্পনা সামনে এসেছে।
রামপুরা বাজারে কথা হয় মুন্নুজান বেগমের সঙ্গে। তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকে ছোট পদে চাকরি করেন। উৎসে কর সম্পর্কে ধারণা থাকায় তিনি জানান, বাজেটের পর আবারও দাম বাড়ার আশঙ্কা করছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির চাপের মধ্যে যদি কর বাড়ে, তাহলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে। তাঁর মতে, এটি নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে।
পাশের হাজীপাড়া এলাকার অটোরিকশা চালক মাসুদ মিয়া অবশ্য সরাসরি উৎসে করের বিষয়টি জানেন না। তবে তিনি নিশ্চিত যে বাজেট এলেই খরচ বাড়ে। যাত্রীদের কথাবার্তা থেকেই তিনি ধারণা পান, এবার চাল, আটা ও রুটিসহ সবকিছুর দাম বাড়তে পারে। এই অনিশ্চয়তা তাকে উদ্বিগ্ন করে তোলে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় ঋণপত্রের কমিশনের ওপর উৎসে কর শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে এক শতাংশ করার প্রস্তাব বাজেটে রাখা হচ্ছে। এটি কার্যকর হলে প্রায় ২৮ ধরনের কৃষিপণ্য এর আওতায় পড়তে পারে। এর মধ্যে ধান, চাল, আটা, গম, ডাল, তেল, চিনি, লবণ, আলু, পেঁয়াজ ও রসুনসহ বহু নিত্যপণ্য রয়েছে। একই সঙ্গে এসব পণ্যের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের দামও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এই করের বাড়তি চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে এমনিতেই নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ চাপে রয়েছে। নতুন কর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে তাদের মত।
যদিও নিয়ম অনুযায়ী উৎসে কর বছরের শেষে হিসাব সমন্বয়ের সুযোগ থাকে, বাস্তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, একবার কর আদায় হয়ে গেলে তা ফেরত পাওয়ার সুযোগ কার্যত থাকে না। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো এই করকে ব্যয় হিসেবে ধরে পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে।
রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি ও কর ফাঁকি রোধের অংশ হিসেবেই এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে কৃষিপণ্যের সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর পুরোপুরি প্রত্যাহারের দাবি দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। তাদের যুক্তি, কৃষি খাতে বড় অংশ কর ব্যবস্থার বাইরে থাকায় বাস্তবে এই কর আদায় কঠিন হয়, কিন্তু এর চাপ পণ্যমূল্যে বেড়ে যায়।
গত তিন বছর ধরে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কর বাড়ানোর পরিকল্পনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। চলতি অর্থবছরে উৎসে কর এক শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছিল। তার আগের বছর কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে এই হার দুই শতাংশ থেকে কমিয়ে এক শতাংশে আনা হয়। এবার আবার তা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, খুচরা বাজারে নগদে কৃষিপণ্য কেনাবেচার বাস্তবতায় উৎসে কর কার্যকর করা কঠিন। তার ভাষায়, অধিকাংশ বিক্রেতা ও কৃষকের টিআইএন নেই এবং তারা আয়কর ব্যবস্থা সম্পর্কেও সচেতন নন। ফলে কৃষিপণ্যের সরবরাহ পর্যায়ে এ ধরনের কর বাস্তবসম্মত নয়।
তিনি মনে করেন, কর বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে খাবারের দামে। কারণ হোটেল ও রেস্তোরাঁ খাত সরাসরি কৃষিপণ্যের বাজারের ওপর নির্ভরশীল। কাঁচামালের মূল্য বাড়লে খাবারের দামও বাড়বে।
শুধু রেস্তোরাঁ খাত নয়, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য শিল্পেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছান বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে জাহাজ ভাড়া। এই পরিস্থিতিতে সহায়তা বাড়ানোর বদলে করের চাপ বাড়ানো হলে কৃষিভিত্তিক শিল্পখাত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যমূল্যে গিয়ে পড়বে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিপিআরসির ‘ইকনোমিক ডায়নামিকস অ্যান্ড মুড অ্যাট হাউজহোল্ড লেবেল ইন মিড ২০২৫’ শীর্ষক গবেষণায় উঠে এসেছে, গত তিন বছরে দেশে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২২ সালে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা বেড়ে প্রায় ২৮ শতাংশে পৌঁছেছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, শহরের পরিবারগুলোর মাসিক আয় কমলেও ব্যয় বেড়েছে। শহরে একটি পরিবারের গড় আয় ৪০ হাজার ৫৭৮ টাকা হলেও ব্যয় ৪৪ হাজার ৯৬১ টাকা। গ্রামে গড় আয় ২৯ হাজার ২০৫ টাকা এবং ব্যয় ২৭ হাজার ১৬২ টাকা। একটি পরিবারের মোট ব্যয়ের প্রায় ৫৫ শতাংশই খাদ্য কেনায় চলে যায়।
এই বাস্তবতায় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন নিম্ন আয়ের মানুষ। রিকশা, ভ্যান ও ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম নাদিম বলেন, স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী মানুষ কম দামের খাবারের ওপর নির্ভরশীল। রুটি, কেকসহ সাধারণ খাবারের দাম বাড়লে তাদের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
কলাম লেখক শাহানা হুদা রঞ্জনাও উৎসে কর বৃদ্ধির সমালোচনা করেছেন। এক লেখায় তিনি উল্লেখ করেন, মানুষের আয় না বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। নতুন কর্মসংস্থান না হওয়ায় বেকারত্ব বাড়ছে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। তার মতে, মধ্যবিত্তের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে নিম্নবিত্তে নেমে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে চাল, ডাল, তেল, ফলসহ ২৮ ধরনের নিত্যপণ্যে কর বৃদ্ধির পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে। সমালোচকদের মতে, লাগাতার মূল্যবৃদ্ধির চাপে সাধারণ মানুষ এমনিতেই বিপর্যস্ত। নতুন কর সেই সংকট আরও গভীর করতে পারে।
তবে এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকারের রাজস্ব আয়ের ওপর চাপ বেড়ে যাওয়ায় উৎসে কর বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তার দাবি, আপাতত এর বিকল্প কোনো কার্যকর প্রস্তাব সরকারের হাতে নেই।

