প্রতি বছরের বাজেট ঘোষণার আগে দেশের সব শ্রেণির মানুষের মধ্যেই এক ধরনের স্বাভাবিক কৌতূহল তৈরি হয়। সরকার কেমন বাজেট ঘোষণা করবে—এ প্রশ্ন ঘিরেই নানা আলোচনা জমে ওঠে।
এক সময়, বিশেষ করে ৮০’র দশকে, বাজেট ঘোষণার দিনটি আলাদা গুরুত্ব পেত। “আজ বাজেট ঘোষণা হবে”—এই খবরেই এলাকায় এক ধরনের আলোড়ন তৈরি হতো। বাজারের বড় চায়ের দোকানগুলোতে মানুষ ভিড় করত। সবাই মাথা উঁচু করে টেলিভিশনের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকত গভীর আগ্রহ নিয়ে।
তখন বাজেট শোনা হতো মূলত বিটিভির মাধ্যমে। সরকারের ভালো-মন্দ নিয়ে টুকটাক আলোচনা চলত সাধারণ মানুষের মধ্যে। সেই সময়ের বাজেট সংক্রান্ত খবর ঘিরে শুধু একটি শ্রেণি নয়, সমাজের নানা স্তরের মানুষ যুক্ত থাকতেন। শিক্ষক, কৃষক, মুদি দোকানদার, চা বিক্রেতা, রিকশাচালক ও কৃষিশ্রমিক—সবাই বাজেটকে নিজেদের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করতেন।
তখন টেলিভিশন দেখা নয়, বরং মানুষের বাজেট-আগ্রহ দেখাই বেশি কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠত। মানুষের মধ্যে বাজেট নিয়ে অপেক্ষা ও আলোচনার একটি ধারাবাহিকতা চোখে পড়ার মতো ছিল। সময় এগিয়েছে। এখন প্রশ্ন জাগে—মানুষ কেন বাজেট নিয়ে এত আগ্রহী? কেন এত আলোচনা?
পরবর্তী সময়ে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। বোঝা যায়, বাজেট শুধু একটি আর্থিক ঘোষণাপত্র নয়, বরং মানুষের জীবনমানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি বাস্তব বিষয়। এই কারণে গ্রামের সাধারণ পরিবার থেকে শুরু করে শহরের বড় অট্টালিকার মানুষ পর্যন্ত, শ্রমিক থেকে মালিক—সবাই নিজেদের জীবনে বাজেটের প্রভাব অনুভব করেন।
বর্তমানে বাজেট ঘোষণার সময় আগের মতো সবাই টেলিভিশনের সামনে বসে না থাকলেও আগ্রহ একটুও কমেনি। বরং বাস্তবতার সঙ্গে সেই আগ্রহ আরও বিস্তৃত ও গভীর হয়েছে। বাজেট নিয়ে এখন নানা মহলে আলোচনা হয়—সংসদ থেকে চায়ের দোকান, মাঠের আড্ডা থেকে খাবার টেবিল, আবার প্রেস ক্লাবের সেমিনার থেকে টেলিভিশনের সংবাদ কক্ষ পর্যন্ত।
এখানে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা, মতবিনিময় ও বিতর্কও চলে। তবে এসব আলোচনার মাঝেও একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে—নিরীহ করদাতাদের প্রত্যাশা কী? তারা মূলত জানতে চান, বাজেটে কোনো খাতে কর ছাড় দেওয়া হয়েছে কি না, করযোগ্য আয়ের সীমা বাড়ানো হয়েছে কি না, কিংবা করহার পরিবর্তন করা হয়েছে কি না—এমন বিষয়গুলোই তাদের সবচেয়ে বেশি আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।
নতুন বাজেটে মোট ব্যয়ের প্রস্তাব ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। মোট বাজেট ধরা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বাজেট বক্তৃতা ও শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী প্রধান খাতগুলোতে বরাদ্দের চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ অর্থ প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার উন্নয়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয় করা হবে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। হাসপাতাল সেবা উন্নয়ন, চিকিৎসা সুবিধা বৃদ্ধি এবং জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমে এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।
প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকার বেশি। সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন এবং জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারে এই ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা। স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, সেবা সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ উন্নয়ন কার্যক্রমে এই অর্থ ব্যয় হবে।
সড়ক ও পরিবহন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অবকাঠামো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে এই অর্থ ব্যয় করা হবে। কৃষি খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষি ভর্তুকি এবং কৃষকের সহায়তায় এই অর্থ ব্যবহৃত হবে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ৪৪ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানি না বাড়লে রিজার্ভ শক্ত ভিত্তি পায় না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এতে সামগ্রিক অর্থনীতিতে ঝুঁকি থেকে যায়।
বিনিয়োগ পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। নতুন শিল্প স্থাপন ও যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে ঋণপত্র খোলা এবং নিষ্পত্তি উভয়ই কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মোট বিনিয়োগের অনুপাত কমে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরে এটি ছিল ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ অর্থাৎ এক বছরে বিনিয়োগ কমেছে শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ পয়েন্ট। এতে উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগে অনীহা স্পষ্ট হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের সময় আগামী বছরের জন্য ৬.৫ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি এবং ৭.৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ঘোষণা করেন। এটিকে উচ্চাভিলাষী ধাপ হিসেবে দেখা হলেও এটি মূলত বৃহত্তর লক্ষ্য—২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার পথে একটি মধ্যবর্তী ধাপ।
এই মধ্যমেয়াদি কাঠামোর ভেতরে আরও বড় লক্ষ্য রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০৩১ অর্থবছরের মধ্যে প্রবৃদ্ধি ৮.৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামানো, মোট বিনিয়োগ মোট দেশজ উৎপাদনের ৪০ শতাংশে উন্নীত করা, বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ ২.৭ শতাংশে নিয়ে যাওয়া এবং কর-জিডিপি অনুপাত ৯.৬ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো—এই লক্ষ্যগুলো কি বাস্তবে অর্জনযোগ্য?
বিনিয়োগের হিসাব ও বাস্তবতা:
উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হলো বিনিয়োগ। সেই কারণে সরকারের মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ২০৩১ সালের মধ্যে মোট বিনিয়োগ মোট দেশজ উৎপাদনের ৪০ শতাংশে পৌঁছাবে। বর্তমানে এই হার প্রায় ২৭ থেকে ২৮ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ২০২৭ অর্থবছরে প্রায় ২১.৩ শতাংশে থাকার পূর্বাভাস রয়েছে। অর্থাৎ আগামী চার বছরে বড় ধরনের বৃদ্ধি ঘটাতে হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, গড়ে প্রায় ৪.৫ অনুপাতের মূলধন-উৎপাদন সম্পর্ক বিবেচনায় নিলে ৮.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে বিনিয়োগকে ৩৮ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে নিতে হয়।
একই সঙ্গে কর-জিডিপি অনুপাতও ৬.৮ শতাংশ থেকে ৯.৬ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এটি দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে কম কর আহরণের একটি দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের জন্য বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। সরকারের বাজেটে আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আয় ১৮ শতাংশের বেশি বৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে, যার বড় অংশ আসবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর আদায় থেকে। অর্থমন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন, প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে বিনিয়োগকে বড় পরিসরে বাড়াতে হবে। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বেসরকারি বিনিয়োগ এখনও দুর্বল, ব্যাংক খাতে তারল্য ও সুশাসন সংকট রয়েছে, পাশাপাশি জ্বালানি ঘাটতি শিল্প উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করছে।
অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, এই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না এবং এটি অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। তার মতে, নীতিগত কাঠামো এবং আর্থিক বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের অসংগতি রয়েছে।
অন্যদিকে অর্থনীতি বিশ্লেষক জ্যোতি রহমান মনে করেন, অর্থনীতি বর্তমানে একটি চক্রাকার মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে ধীরে ধীরে বেসরকারি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধার হতে পারে। তবে ২০৩১ সালের মধ্যে ৮.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য শুধু স্বাভাবিক পুনরুদ্ধার যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং কার্যকর নীতিগত ব্যবস্থাপনা।
বৈদেশিক বিনিয়োগের লক্ষ্য ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ:
প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকার বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগকে ২০৩১ সালের মধ্যে ২.৭ শতাংশে উন্নীত করতে চায়। এটি বাস্তবায়িত হলে বার্ষিক প্রবাহ দাঁড়াবে প্রায় ১৭ থেকে ১৮ বিলিয়ন ডলার। তবে বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ ছিল মাত্র প্রায় ১.৭ বিলিয়ন ডলার। এমনকি ভালো বছরগুলোতেও এটি ৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারেনি। অর্থাৎ লক্ষ্য পূরণে প্রায় দশগুণ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের মূল চাবিকাঠি হলো নীতি ও নিয়মের স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। বিনিয়োগকারীদের জন্য জমি ও জ্বালানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ যদি ভিয়েতনাম বা অন্যান্য সফল অর্থনীতির মতো বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চায়, তাহলে প্রচারের চেয়ে বাস্তব পরিবেশ উন্নয়ন বেশি জরুরি।
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বড় ধরনের রূপান্তরের পথে নিতে একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা সামনে এনেছে নির্বাচিত বিএনপি সরকার। প্রস্তাবিত বাজেটে এই রূপান্তরের কৌশল ও লক্ষ্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। লক্ষ্য অনুযায়ী আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের বিনিয়োগের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকারি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় মোট বিনিয়োগ যেখানে ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ ছিল, তা ২০২৮-২৯ অর্থবছরে বাড়িয়ে ৩৬ দশমিক ৮২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে বিনিয়োগ প্রায় ৮ দশমিক ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে চারটি প্রধান কৌশল তুলে ধরা হয়েছে।
- প্রথমত, বিভিন্ন খাতে নিয়ন্ত্রণ শিথিল বা বিনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। এর আওতায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে কেন্দ্র করে সংস্কার কার্যক্রম নেওয়া হবে।
- দ্বিতীয়ত, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি কাঠামো শক্তিশালী করা এবং প্রকল্পের পাইপলাইন সম্প্রসারণ।
- তৃতীয়ত, ঋণের সুদহার কমাতে ধাপে ধাপে মুদ্রানীতি শিথিল করা।চতুর্থত, আর্থিক ও পুঁজিবাজার সংস্কারের মাধ্যমে
- ঋণ মধ্যস্থতা ব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং শেয়ারবাজারের কার্যকারিতা ও গতিশীলতা বৃদ্ধি।
রাজস্ব বাড়াতে সরকারের ছয় কৌশল:
কর প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তর: কর ফাঁকি, তথ্য গোপন এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা কমাতে কর ব্যবস্থাপনাকে প্রযুক্তিনির্ভর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে করসংক্রান্ত কার্যক্রম স্থানান্তরের পাশাপাশি অনুমোদিত সফটওয়্যারে সংরক্ষিত হিসাবকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
করনীতি ও প্রশাসনের পৃথকীকরণ: করনীতি প্রণয়ন এবং রাজস্ব প্রশাসনের কাজ আলাদা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের বিশ্বাস, এতে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন উভয় ক্ষেত্রেই দক্ষতা বাড়বে।
করজাল সম্প্রসারণ: বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করার বিধান রাখা হয়েছে। ব্যাংক হিসাব, ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক সেবায় এর ব্যবহার বাড়ানো হবে।
কর ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থা: আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত কার্যক্রমের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ, নথি যাচাই এবং তদন্ত কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার মাধ্যমে কর ফাঁকি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরোক্ষ কর থেকে আয় বৃদ্ধি: বিদেশি ডিজিটাল সেবার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন আমদানিকৃত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, কোমল পানীয় ও তামাকজাত পণ্যের ওপর উচ্চ সম্পূরক শুল্ক বহাল রাখা হয়েছে বা বাড়ানো হয়েছে।
‘থ্রি আর’ কৌশল: সরকার অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকন্সট্রাকশনভিত্তিক এই কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির আশা করছে সরকার।
৩০০ আসনে সমান বাজেট বণ্টনের দাবি সংসদে:
বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট প্রতি বছরই জনগণের করের অর্থে তৈরি হয়। দেশের বিভিন্ন খাত, অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য এই বাজেট বরাদ্দ করা হয়। তবে বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই বৈষম্য ও অসম বণ্টনের অভিযোগ ও আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের করের টাকা কোথায় যাচ্ছে এবং কারা এর সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে—এই প্রশ্নটি বারবার সামনে আসে।
গত ২১ জুন রোববার জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের সাধারণ আলোচনায় সংসদ সদস্যরা বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে সব আসনের মধ্যে সমান বণ্টনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। আলোচনায় অংশ নেওয়া সদস্যদের মতে, সকল সংসদ সদস্যের অধিকার সমান হওয়ায় বাজেটও সমভাবে বিতরণ করা উচিত। তারা বলেন, সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যাতে বাজেট বরাদ্দ ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে সমভাবে বিতরণ করা হয়। শুধু মন্ত্রীদের নির্বাচনী এলাকা অগ্রাধিকার না পাওয়ার বিষয়েও তারা প্রশ্ন তোলেন।
বাজেটের লক্ষ্য ও দর্শন:
বাজেট নিয়ে আলোচনায় নারী আসন–৮ এর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটের মূল দর্শন একটি দ্রুত উন্নয়নশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা। হবিগঞ্জ–২ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান বলেন, এই বাজেট একটি কল্যাণরাষ্ট্রের দিকে অগ্রযাত্রার লক্ষ্যে প্রণীত।
সমালোচনা ও উদ্বেগ:
জামায়াতে ইসলামীর যশোর–৫ আসনের সংসদ সদস্য বলেন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বাজেট বাস্তবায়ন আরও সহজ হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তিগত আয়কর সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণ প্রসঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নোয়াখালী–৬ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসুদ বলেন, আগের ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার সীমা থেকে মাত্র ২৫ হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে, যা নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
নড়াইল–২ আসনের বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য এম আতাউর রহমান বলেন, বাজেট সর্বোচ্চ ঘাটতি ও ঋণনির্ভর। তার মতে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তব পরিস্থিতির তুলনায় অবাস্তব।
বাজেট প্রক্রিয়া ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ:
বাংলাদেশে বাজেট প্রণয়ন ও অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়া মূলত কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় বাজেট প্রস্তাব তৈরি করে এবং জাতীয় সংসদে তা উপস্থাপন করা হয়। পরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়। নীতিগতভাবে এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য হলো জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। তবে সমালোচকদের মতে, বাস্তবে অনেক সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বেশি থাকায় স্থানীয় পর্যায়ের প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।
উন্নয়ন বণ্টনে বৈষম্যের অভিযোগ:
বিভিন্ন সময় নাগরিক সমাজ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ অভিযোগ করে থাকেন যে, বাজেটের বড় অংশ কিছু নির্দিষ্ট খাত, প্রকল্প বা প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই কেন্দ্রীভূত হয়ে যায়। এতে সাধারণ জনগণের সরাসরি উপকার হয় এমন খাতে তুলনামূলকভাবে কম অগ্রাধিকার পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়। বিশেষ করে বড় অবকাঠামো প্রকল্প, প্রশাসনিক ব্যয় এবং কেন্দ্রীয় উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয়ের হার বেশি হওয়ায় গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের উন্নয়ন পিছিয়ে পড়ে—এমন ধারণাও আলোচনায় আসে।
জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন:
বাজেট বৈষম্য আলোচনায় আরেকটি বিষয় প্রায়ই উঠে আসে, তা হলো স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ করা হয় যে, জাতীয় বাজেট প্রণয়নে সংসদ সদস্যদের বাস্তব প্রভাব সীমিত থাকে। স্থানীয় উন্নয়ন চাহিদা, রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা স্বাস্থ্যসেবার মতো বিষয়গুলো স্থানীয় পর্যায় থেকে উঠে এলেও সেগুলো বাজেটে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না—এমন সমালোচনাও রয়েছে। ফলে জনগণের প্রত্যাশা ও বাজেট বাস্তবায়নের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয় বলে মনে করেন কিছু বিশ্লেষক।
করের অর্থ ব্যবহারের প্রশ্ন:
দেশের সাধারণ মানুষ আয়কর, ভ্যাটসহ বিভিন্ন ধরনের করের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বাজেটে অবদান রাখে। এই অর্থই সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যয় করা হয়। তবে কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, এই করের অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। বাজেটের একটি অংশ প্রশাসনিক ব্যয়, ভর্তুকি এবং বড় প্রকল্পে ব্যয় হলেও সাধারণ মানুষের জীবনে তার সরাসরি প্রভাব সবসময় সমানভাবে দৃশ্যমান হয় না।
উন্নয়ন প্রকল্পে কেন্দ্রীয়করণ:
বিভিন্ন উন্নয়ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বড় অবকাঠামো প্রকল্প ও জাতীয় পর্যায়ের কর্মসূচিতে বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হয়। এর ফলে জাতীয় উন্নয়ন সূচক উন্নত হলেও স্থানীয় পর্যায়ের ছোট কিন্তু জরুরি প্রকল্পগুলো অনেক সময় পিছিয়ে পড়ে। এই ধরনের কাঠামোকে কেন্দ্র করে কিছু অর্থনীতিবিদ বলেন, উন্নয়ন পরিকল্পনায় ভারসাম্য না থাকলে আঞ্চলিক বৈষম্য বাড়তে পারে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে আলোচনা:
বাজেট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকার নিয়মিতভাবে বাজেট প্রতিবেদন প্রকাশ করে এবং সংসদে তা আলোচনা হয়। তবে বাস্তবায়ন পর্যায়ে তথ্য সহজলভ্যতা এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে বলে কিছু মহল মনে করে। এই কারণে বাজেটের প্রকৃত সুফল কতটা জনগণের কাছে পৌঁছাচ্ছে, তা নিয়ে বিভিন্ন মতামত তৈরি হয়।
উন্নয়ন ও বাস্তবতার ব্যবধান:
অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, বাংলাদেশে বাজেটের আকার প্রতি বছর বাড়লেও উন্নয়ন বণ্টনে ভারসাম্য সবসময় সমানভাবে বজায় থাকে না। একদিকে বড় প্রকল্প ও অবকাঠামো উন্নয়ন, অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সেবার চাহিদা—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়। ফলে উন্নয়নের সুফল শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলে সমানভাবে পৌঁছায় না—এমন আলোচনা বারবার সামনে আসে।
সমান বণ্টনের দাবি:
নরসিংদী–৫ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন বলেন, সকল সংসদ সদস্যের অধিকার সমান। তাই বাজেট বরাদ্দ সব আসনে সমানভাবে বণ্টন করা উচিত, শুধু মন্ত্রীদের আসনে নয়। তিনি আরও বলেন, অতীতে দেখা গেছে বাজেট ঘোষণা করা হলেও বরাদ্দ মূলত মন্ত্রীদের আসনেই গেছে, অন্য সংসদ সদস্যরা কিছুই পাননি। তার মতে, সরকারের উচিত সমান বণ্টন নিশ্চিত করা।
তিনি পূর্ববর্তী বিএনপি শাসনামলের উদাহরণ টেনে বলেন, নরসিংদী–৩ আসনে তৎকালীন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর এলাকায় প্রায় ৯৯ শতাংশ কাঁচা রাস্তা পাকা করা হয়েছিল, কিন্তু তাঁর নিজের আসনে এবং পাশের আসনে অন্তত ৬০ শতাংশ কাঁচা রাস্তা তখনও পাকা হয়নি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি সব বরাদ্দই মন্ত্রীদের আসনে যায়, তাহলে ৩০০টি আসনের সংসদ কেন আছে—এ কারণেই সমান বণ্টনের ওপর জোর দেওয়া দরকার।
বাজেট বৈষম্য নিয়ে আলোচনাটি মূলত উন্নয়ন বণ্টন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পর্কিত। একদিকে বাজেট জাতীয় অর্থনীতির অগ্রগতির প্রধান হাতিয়ার, অন্যদিকে এর বণ্টন কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন ও সমালোচনাও বিদ্যমান। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে উন্নয়ন পরিকল্পনায় আঞ্চলিক ভারসাম্য, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী করা গেলে এই ধরনের বৈষম্য নিয়ে বিতর্ক কমতে পারে।
সব মিলিয়ে বাজেট শুধু আয়–ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং রাষ্ট্রের উন্নয়ন অগ্রাধিকার ও নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিচ্ছবি। কিন্তু এই প্রতিচ্ছবির ভেতরেই আবার প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে—উন্নয়ন কি সত্যিই সবার জন্য সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, নাকি কিছু নির্দিষ্ট খাতে ও এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকছে?
একদিকে উচ্চ প্রবৃদ্ধি, বড় লক্ষ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার ঘোষণা, অন্যদিকে বিনিয়োগে ধীরগতি, ঘাটতি অর্থায়ন ও আঞ্চলিক বৈষম্যের অভিযোগ—এই দুই বাস্তবতা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বাজেটকে আরও জটিল করে তুলছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই থেকে যাচ্ছে মানুষের কাছেই—তাদের করের টাকায় তৈরি এই বিশাল বাজেট শেষ পর্যন্ত কতটা তাদের জীবনমান বদলাতে পারছে, আর কতটা কেবল কাগজে-কলমেই উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি হয়ে থাকছে।

