বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের বড় একটি অংশ আসছে দুইটি সমৃদ্ধশালী দেশ-আমিরাত এবং যুক্তরাজ্য থেকে। এ দুটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘকালীন সম্পর্ক, শ্রমবাজারের প্রয়োজনীয়তা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা প্রবাসী আয়ের এ প্রবাহের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে যার ভূমিকা যেমন প্রশংসনীয়, তেমনি এর মাধ্যমে একে অপরের সাথে যুক্ত হচ্ছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত এবং বহু মানুষের জীবিকা। আর এ প্রবাসী আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে বর্তমানে সেরা অবস্থানে রয়েছে দুটো দেশ- সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাজ্য। এই দুই দেশই নানা কারণে বাংলাদেশের জন্য প্রবাসী আয়ের শীর্ষস্থানীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত: শ্রমবাজারের বিশাল চাহিদা-
আমিরাত বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য দীর্ঘকাল ধরে গুরুত্বপূর্ণ একটি গন্তব্য। ১৯৭০-এর দশকে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ- আমিরাত সম্পর্কের ফলে আজ আমিরাতে বাংলাদেশী শ্রমিকদের সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। বিশেষতঃ নির্মাণ খাত, গৃহকর্মী, নিরাপত্তা, গাড়িচালক এবং পরিষেবাজাতক কাজগুলোতে বাংলাদেশীদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আমিরাতে বাংলাদেশের শ্রমিকদের জন্য আয়ও তুলনামূলকভাবে ভালো এবং সেখানে বসবাসের সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। এটি প্রবাসীদের জীবনের নিরাপত্তা এবং পরিবারের জন্য রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সহজ করেছে। আমিরাতের সরকারও শ্রমিকদের কল্যাণে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যেমন: শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা, কাজের পরিবেশ উন্নত করা, বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং শ্রমিকদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য নতুন নীতি প্রণয়ন। এইসব কারণে, আমিরাতে বাংলাদেশের প্রায় ৩০ লাখেরও বেশি শ্রমিক কর্মরত রয়েছে এবং তারা নিয়মিতভাবে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। রেমিটেন্স যোদ্ধাদের এই অবদান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।
যুক্তরাজ্য: শিক্ষার্থী ও দক্ষ কর্মীদের প্রবাহ-
যুক্তরাজ্য বাংলাদেশীদের জন্য শুধু একটি কর্মসংস্থানের গন্তব্য নয় বরং উচ্চশিক্ষার জন্য অন্যতম একটি প্রধান দেশ। সারা বছর সেখানে প্রায় ৮০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশী শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি এসব শিক্ষার্থী “আংশিক সময়ের” কাজ করে নিজের খরচ চালাচ্ছেন এবং তাদের পরিবারের জন্য রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। দেশটির উন্নত ও বাস্তবমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা, বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান এবং চাকরির সুযোগ বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের কাছে যুক্তরাজ্যকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে দক্ষ পেশাদার যেমন: চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইটি বিশেষজ্ঞদের জন্যও ব্যাপক সুযোগ- সুবিধা রয়েছে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞ ও দক্ষ পেশাদাররা সেখানে ভালো আয় এবং কর্মজীবনের সংস্থান পান। যা তাদের সেখানে উন্নত জীবনযাপন এবং দেশে পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণকে বৃদ্ধি করেছে। এখানকার আয় সাধারণত বেশি এবং স্থিতিশীল হওয়ায় বাংলাদেশী প্রবাসীরা দীর্ঘমেয়াদী কর্মসংস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।
আমিরাত এবং যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশীরা রেমিট্যান্স প্রেরণ করার ক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে সুবিধা পাচ্ছেন। বিশেষ করে আমিরাতে যেহেতু বাংলাদেশী শ্রমিকদের অধিকাংশই ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করেন, ফলে তারা সহজেই মোবাইল ব্যাংকিং বা অন্যান্য ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠাতে সক্ষম হচ্ছেন। যুক্তরাজ্যে আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রবাসীরা দ্রুত ও নিরাপদে তাদের আয় দেশে পাঠাচ্ছেন, যা প্রবাসী আয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা এবং দিকনির্দেশনা: বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন প্রণোদনা এবং সুবিধার মাধ্যমে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিকদের সহায়তা প্রদান করে আসছে। এই সহায়তা ও প্রণোদনাগুলোর মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণ আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারের একাধিক প্রোগ্রাম, যেমন “বিকাশ” বা “নগদ”- এর মতো মোবাইল আর্থিক পরিষেবা, প্রবাসীদের আয়ের প্রেরণ সহজ করে তুলেছে। আমিরাত এবং যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশীরা এসব সুবিধার পূর্ণ ব্যবহার করে তাদের পরিবারের জন্য সাশ্রয়ী, নিরাপদ এবং দ্রুত রেমিটেন্স পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পেরেছেন।
আমিরাত এবং যুক্তরাজ্য- উভয় দেশের সাথে বাংলাদেশের এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে, আমিরাতে বাংলাদেশী প্রবাসীদের জন্য রয়েছে এক শক্তিশালী সামাজিক নেটওয়ার্ক যা তাদের একে অপরকে সহায়তা করতে এবং অভ্যস্ত হতে সহায়তা করেছে। এই সম্পর্কের ফলে তারা দ্রুত ভালো মানের আয় করতে এবং রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে নিরাপদ পথ অবলম্বন করতে সক্ষম হচ্ছেন।
পরিশেষে বলা যায়, আমিরাত এবং যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের প্রধান উৎস হওয়ার পেছনে অনেকগুলো কারণ কাজ করছে- বিশাল শ্রমবাজারের চাহিদা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, সরকারের সহযোগিতা এবং দীর্ঘকালীন ঐতিহ্য। এই দুই দেশে বাংলাদেশের শ্রমিক, শিক্ষার্থী এবং পেশাদারদের উপস্থিতি এবং তাদের দক্ষতার মূল্যায়ন বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি হল এই রেমিটেন্স। তাদের আয়ে গ্রামবাংলায়ও শহরের মতো উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। এই রেমিট্যান্স যুদ্ধাদের কল্যাণে গ্রাম বাংলায়ও শহরের মতো উচ্চ অট্টালিকা ও শান শওকত চোখে পড়ে। আশা করা যায় দুই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশী প্রবাসী সম্পর্ক আরো উত্তোরোওর বৃদ্ধি পাবে। যা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিক উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

