বাংলাদেশে চলমান ডলার সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ঘাটতি মোকাবিলায় বাজেট সহায়তার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই সহায়তা পেতে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে সরকার।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশকে এ সংকট উত্তরণে ৪০ কোটি ডলার বা প্রায় ৪৪০০ কোটি টাকা বাজেট সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই অর্থ ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (সিআরআইডি) এর আওতায় প্রদান করা হবে।
সহায়তা দ্রুত নিশ্চিত করতে কমিটি গঠন-
অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে ১৬ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ড. জিয়াউল আবেদীনকে, যিনি অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (সামষ্টিক অর্থনীতি)। সদস্য সচিবের দায়িত্বে রয়েছেন তাসনোভা রহমান, অর্থ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব (রাজস্ব-৩)। এই কমিটির মূল লক্ষ্য হলো পলিসি অ্যাকশন চূড়ান্ত করা এবং সেগুলোর বাস্তবায়ন দ্রুততর করা।
কমিটিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং সংস্থার প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
বাজেট সহায়তার সুবিধা ও প্রক্রিয়া-
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সাবেক সিনিয়র সচিব কাজী শফিকুল আযম জানিয়েছেন, বাজেট সহায়তা এমন একটি সহায়তা, যা কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ নয়। সরকার তার প্রয়োজন ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এই অর্থ ব্যবহার করতে পারে। এতে শর্তের কঠোরতা কম থাকায় এটি রিজার্ভ ঘাটতি পূরণ ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভারসাম্য আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি আরও জানান, বাজেট সহায়তার ক্ষেত্রে এডিবির অন্যান্য ঋণের মতোই সুদের হার, রেয়াতকাল এবং পরিশোধের শর্ত প্রযোজ্য হয়।
পূর্বের প্রতিশ্রুতি এবং বর্তমান পরিস্থিতি-
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এডিবি গত দুই অর্থবছরের জন্য মোট ৮০ কোটি ডলার বা প্রায় ৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বাজেট সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এর মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সাব প্রোগ্রাম-১ এর আওতায় ৪০ কোটি ডলার ছাড় করা হয়।
বর্তমানে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য সাব প্রোগ্রাম-২ এর আওতায় আরও ৪০ কোটি ডলার ছাড় দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনা চলছে। ইতোমধ্যে অর্থপ্রাপ্তির সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে এবং ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই অর্থ ছাড় নিশ্চিত হতে পারে।
বাজেট সহায়তার অঙ্ক বৃদ্ধির সম্ভাবনা-
ইআরডির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এডিবি প্রাথমিকভাবে ৪০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি দিলেও পরবর্তীতে আরও ২০ কোটি ডলার যোগ করে মোট ৬০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনুরোধের প্রেক্ষিতে এডিবি বাজেট সহায়তার পরিমাণ বাড়িয়েছে। তবে এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের গঠিত কমিটির কাজ সম্পর্কে তার কোনো তথ্য নেই।”
বৈঠক ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা-
গত সেপ্টেম্বরের প্রথমদিকে এডিবিসহ তিন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাজেট সহায়তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান, ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী এবং এডিবির পরিচালক চিকদেম একিন। বৈঠক শেষে ড. সালেহউদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, “ডিসেম্বরের মধ্যেই এডিবির বাজেট সহায়তা আসবে বলে আমরা আশাবাদী।”
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগ-
ডলার সংকট ও বাজেট ঘাটতির চাপে ন্যুব্জ অর্থনীতিতে এডিবির বাজেট সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একইসঙ্গে এটি রিজার্ভ বৃদ্ধির মাধ্যমেও দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে সহায়ক হবে। তবে এর যথাযথ ব্যবহারের ওপর নির্ভর করবে সরকারের এই উদ্যোগের সফলতা।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার কাছ থেকে এমন সহায়তা আদায় করতে পারা দেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি বড় অর্জন। এর পাশাপাশি সরকারের উচিত বাজেট ঘাটতি ও ডলার সংকট দীর্ঘমেয়াদে কাটিয়ে ওঠার জন্য একটি টেকসই অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়ন করা।

