সদ্য সমাপ্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বরাবরই আলোচনার বিষয় হয়ে থাকা ব্যক্তি হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনে তার বিজয় লাভের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় মানুষের মাঝে কৌতুহলের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এমন একটি বিষয় হলো ট্রাম্পের জয়ের সাথে বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবেরের লাভ বা মুনাফা। ট্রাম্পের বিজয়ের সাথে সাথে একক ব্যক্তিত্ব, যিনি ট্রাম্পের নির্বাচনীয় বিজয়ের মুনাফার অংশীদার হয়েছেন তিনি হলেন ইলন মাস্ক। বিশ্ব রাজনীতি এবং প্রযুক্তি জগতের দুই শীর্ষ ব্যক্তিত্ব- ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইলন মাস্ক বর্তমান সময়ে ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের জয় তার রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে। কিন্তু এই বিজয়ের পাশাপাশি প্রযুক্তি খাতে ইলন মাস্কের অবদানও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মাস্কের নেতৃত্বেই টেসলা, স্পেসএক্স এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তির ধারা পরিবর্তন করেছে।
তবে দুই ব্যক্তিত্বের সফলতা শুধু তাঁদের নিজ নিজ ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল এবং মাস্কের ব্যবসায়িক উদ্ভাবন একে অপরের বিপরীতে চললেও তাঁদের দুজনের এক হাত হওয়ার সম্ভাবনা পৃথিবীজুড়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি করছে। ট্রাম্পের নির্বাচনী জয় যেমন আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বৈশ্বিক সম্পর্কের উপর গভীর প্রভাব ফেলবে, তেমনি মাস্কের প্রযুক্তিগত সাফল্য বিশ্বকে নতুন একটি ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করাচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক জয়-
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয়বারের জন্য নির্বাচনে জয় একটি বিশাল ঘটনা। আগের শাসনামলে ট্রাম্প দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করেছিলেন, বেকারত্ব কমিয়ে ছিলেন এবং একাধিক আলোচিত ও বিতর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তি পুনর্বিবেচনা করেছিলেন। তাঁর নীতিগত অবস্থান বিশেষ করে অভিবাসন বিরোধিতা, পররাষ্ট্রনীতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা থাকলেও তাঁর সমর্থকরা মনে করেন তিনি দেশের স্বার্থ রক্ষায় সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা।
এই নির্বাচন ট্রাম্পের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের আস্থাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে এর সাথে পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও দেখা দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজন এই সবই ট্রাম্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু তাঁর অনন্য রাজনৈতিক কৌশল তাকে এখনও শক্তিশালী এবং বিরোধী মতের উপর প্রভাবশালী করে রেখেছে।
এই প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু যে বিষয়টি ছিল তা হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে আরেক জগতের ব্যক্তিত্ব ইলন মাস্কের সম্পর্ক। ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ইলন মাস্কের সম্পদে নজিরবিহীন বৃদ্ধি ঘটেছে। সিএনএন এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের বিজয়ে মাস্কের সম্পদ রাতারাতি প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার বেড়ে গেছে। কিন্তু এই লাভের পথ সুগম করতে মাস্ক নিজেই আগে থেকে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছিলেন। রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রচারণায় মাস্ক প্রায় ১১৯ মিলিয়ন ডলার দান করেছেন এবং অন্যদেরকে দান করতে উৎসাহিত করেছেন। যা ট্রাম্পের প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও সমর্থনের নির্দেশ করে।
ট্রাম্পের বিজয়ের সাথে সাথে মাস্কের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার শেয়ারের দাম বেড়ে যায় ৪১১ মিলিয়ন ডলার। মাস্কের সম্পদে এই প্রবৃদ্ধি তাঁকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে এনে দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়ী হওয়ার পর শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক এবার নতুন প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে চলেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে- টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা মাস্ককে এবার “সরকারি দক্ষতা বিভাগ” এর নেতৃত্বে দেখা যাবে। এই নতুন বিভাগের লক্ষ্য থাকবে কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেট থেকে বিশাল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করা। ভোটের আগেই মাস্ক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তাঁর নেতৃত্বাধীন বিভাগটি প্রায় দুই লাখ কোটি ডলার বাজেট সাশ্রয়ে কাজ করবে। সরকারি খরচ কমিয়ে দক্ষতা বাড়ানোই হবে মাস্কের মূল উদ্দেশ্য। মাস্কের মতো প্রযুক্তিবিদ ও উদ্ভাবকের নেতৃত্বে এই বিভাগটি সরকারি কার্যক্রমে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত দূরদর্শিতা কাজে লাগিয়ে মাস্ক কিভাবে এ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে পৌঁছাবেন, তা নিয়েই এখন চলছে আলোচনা।
তাছাড়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকানদের প্রচারণায় বিপুল পরিমাণ অর্থ দান করার পর ট্রাম্পের বিজয়ে মাস্কের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। টেসলার এই শেয়ার বৃদ্ধির ঘটনা নতুন করে প্রমাণ করে কিভাবে রাজনৈতিক সমর্থন ও বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসায়িক সাফল্যের সুযোগ তৈরি হয়। এই সম্পর্ক কি শুধুই অর্থনৈতিক, নাকি ব্যবসা ও রাজনীতির পারস্পরিক সহায়তার উদাহরণ- এ নিয়েও চলছে আলোচনা।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মাস্কের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের পরিবর্তন-
যদিও ট্রাম্পের বিজয় রাজনৈতিক জগতের দিক থেকে আলোচিত, সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক এ জগতে ট্রাম্পের বিজয়ের পেছনে ইলন মাস্কের প্রভাব আরও বিস্তৃত। এক সময়ের পরিবেশপন্থী উদ্যোক্তাকে এখন ট্রাম্পের পক্ষে সোচ্চার হতে থাকলেও অতীতে তাদের সম্পর্কের তিক্ততা ছিল আলোচনার বিষয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেয়া এই ৫৩ বছর বয়সী উদ্যোক্তা একসময় পরিচিত ছিলেন পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির মুখ হিসেবে। বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার কর্ণধার হিসেবে তিনি সবুজ প্রযুক্তির অগ্রদূত হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সোচ্চার মাস্ক ২০১৭ সালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থান নিয়ে তখনকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সমালোচনায় মুখর ছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তিনি প্রেসিডেন্টের দুটি পরামর্শক পরিষদ থেকে পদত্যাগও করেছিলেন।
কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় আজ ইলন মাস্ক-
ট্রাম্পের একজন উল্লেখযোগ্য সেলিব্রিটি সমর্থক। তাঁর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন অনেককেই অবাক করেছে। তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মধ্যে একটি। গতবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলে হেরে যাওয়ার পর ক্যাপিটাল হিলে ট্রাম্পের নির্দেশে যখন দাঙ্গা ঘটে, তখন টুইটার বা বর্তমানে এক্স-এ ট্রাম্পের একাউন্ট বাতিল করে দেওয়া হয়। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় টুইটার বা বর্তমানে এক্সের মালিক ইলন মাস্ক ট্রাম্পকে তার একাউন্ট ফিরিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি করেছেন। “মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন” প্রচারণায় ট্রাম্পকে পুনরায় হোয়াইট হাউসে আনার পক্ষে মাস্কের সমর্থন প্রমাণ করে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে অতীতের বৈরিতা সমাধান করে তারা একসাথে আবারও হাত মিলিয়েছেন।
মূলতঃ ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইলন মাস্কের সম্পর্ক অনেক বাঁধার মধ্য দিয়ে গিয়েছে। কখনো মতের অমিল, কখনো ব্যবসার টানাপোড়ন সব মিলিয়ে তাদের সম্পর্ক অনেক সময় জটিল ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সেই বাধাগুলো কেটে গেছে। এখন তাদের বন্ধুত্ব যেন নতুন রঙে রঙিন হয়েছে। পুরনো ভুল বোঝাবুঝি দূর হয়ে তারা একসাথে নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে চলেছেন। দুটি বিপরীত জগতের প্রতিষ্ঠিত দুই ব্যক্তির এই বন্ধুত্ব দুজনের জন্য এমনকি বিশ্ব পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে আরও ভালো কিছু বয়ে আনতে পারে বলেই আশা করা হচ্ছে।

