বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো ইতোমধ্যেই নবায়নযোগ্য শক্তি খাতের উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে পরিবেশ বান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনে কর অবকাশ সুবিধা প্রদান একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। এমন উদ্যোগ কেবল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে না, একই সাথে পরিবেশ সুরক্ষায় এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।
নবায়নযোগ্য শক্তি হলো এমন এক ধরনের শক্তি, যা বারবার ব্যবহার করা যায় এবং যা কখনোই শেষ হয়ে যায় না। প্রকৃতির কিছু শক্তির উৎস যেমন: সূর্যালোক, বাতাস, পানি, সমুদ্রের ঢেউ ও জোয়ার-ভাটা এবং ভূ-গর্ভস্থ তাপ থেকে এই শক্তি পাওয়া যায়।
বৈশ্বিক উষ্ণতা ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই শক্তির গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। সৌরশক্তি বা সূর্যের আলো, জলবিদ্যুৎ, বায়ুপ্রবাহ, ভূ-তাপীয় শক্তি (জিয়োথারমাল), সমুদ্রের তরঙ্গ এবং জৈবজ্বালানি নবায়নযোগ্য শক্তির জনপ্রিয় উৎস। এছাড়া শহরের আবর্জনা এবং হাইড্রোজেন জ্বালানি কোষ থেকেও শক্তি উৎপাদন করা যায়। নবায়নযোগ্য শক্তির এই উৎসগুলোকে ব্যবহার করে আমরা প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় কমাতে এবং পরিবেশ দূষণ রোধে বড় ভূমিকা রাখতে পারি। এই শক্তি ব্যবহারে আমাদের যেমন ভবিষ্যৎ শক্তির চাহিদা পূরণ হবে, তেমনি পৃথিবীর পরিবেশও সুস্থ থাকবে।
নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের বর্তমান অবস্থাঃ
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্ব এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে এবং পরিবেশ দূষণ কমাতে বিশ্বের অধিকাংশ দেশই এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশেও এই খাতে উন্নয়নের প্রচেষ্টা চলছে। তবে বিশ্বমানের সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের অগ্রগতি এখনও অনেক পিছিয়ে। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রধান উৎস এখনো জলবিদ্যুৎ। চট্টগ্রামের কাপ্তাই এলাকায় কর্ণফুলী নদীর উপর স্থাপিত কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের একমাত্র বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, যার বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াট। তবে, এটি মোট বিদ্যুৎ চাহিদার তুলনায় অনেক কম।
বিশ্লেষকদের গবেষণা রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, বিশ্বের ১৯০টি দেশের মধ্যে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ১১১তম। তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার ও উন্নয়নের দিক থেকে বাংলাদেশ বেশ পিছিয়ে আছে। এনার্জি আর্কিটেকচার পারফরম্যান্স ইনডেক্স ২০২৩ অনুযায়ী, বিদ্যুতের দক্ষতার দিক থেকে ১২৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৮তম। এসব তথ্য আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, নবায়নযোগ্য শক্তির খাতে উন্নতির জন্য দেশে আরও কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজন।
২০৪১ সালের লক্ষ্যমাত্রা ও চ্যালেঞ্জ:
বাংলাদেশ সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গেলে প্রায় ২৪,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন করতে হবে, যেখানে আমাদের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০,০০০ মেগাওয়াট। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বৃহৎ আকারের সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বায়ু শক্তি প্রকল্প এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তির উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এই লক্ষ্য অর্জনে সরকারি-বেসরকারি ও বিদেশী উদ্যোক্তাদের ব্যাপক বিনিয়োগ প্রয়োজন। যা নিশ্চিত করতে বিনিয়োগকারীদের জন্য কর অবকাশ একটি কার্যকরী সহায়ক হতে পারে। কর অবকাশের সুবিধা থাকলে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদীভাবে এই খাতে বিনিয়োগে আকৃষ্ট হবে এবং সোলার, উইন্ড ও বায়োগ্যাস ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়িত হবে।
নবায়নযোগ্য শক্তির সম্ভাব্য উৎস ও সুযোগ:
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস হিসেবে জলবিদ্যুৎ, সৌরশক্তি ও বায়ু শক্তির প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চল, উপকূলীয় দ্বীপগুলো এবং পার্বত্য এলাকায় সৌরশক্তি উৎপাদনের উপযোগী স্থান রয়েছে। এছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে বায়ু শক্তির সম্ভাবনা রয়েছে, যা সঠিক প্রযুক্তি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে কাজে লাগানো সম্ভব। তাছাড়া শহরের পরিত্যক্ত বর্জ্য এবং বায়োগ্যাস থেকেও নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন করা যেতে পারে। যা পরিবেশ দূষণও হ্রাস করবে এবং আমাদের পরিচ্ছন্ন নগরী উপহার দিবে।
কর অবকাশ ও প্রণোদনা:
নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন ব্যয়বহুল। বিশেষ করে যখন বড় আকারের সোলার প্ল্যান্ট বা উইন্ড টারবাইন প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা আসে। কর অবকাশের সুবিধা থাকলে এই ব্যয় বহুল প্রকল্পগুলোর শুরুতে অনেক খরচ কমে আসবে, ফলে বিনিয়োগকারীদের আর্থিক ঝুঁকিও কমবে। কর অবকাশের ফলে লাভের অংশ থেকে করের পরিমাণ কমে যাওয়ায় উদ্যোক্তারা দ্রুত তাদের বিনিয়োগ ফেরত পেতে সক্ষম হবে। যা এই খাতে নতুন বিনিয়োগে আরও উৎসাহ দেবে।
অন্যান্য দেশের উদাহরণ থেকে দেখা যায়, কর অবকাশ সুবিধা দেওয়ার ফলে নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। উদাহরণ স্বরূপ- ভারতে সোলার এবং উইন্ড পাওয়ার প্রকল্পে কর অবকাশের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। যার ফলে দেশটিতে নবায়নযোগ্য শক্তির উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশেও একই ধরণের নীতি প্রণয়ন করা হলে একই রকম ইতিবাচক ফলাফল দেখা যেতে পারে।
কর অবকাশ সুবিধা পাওয়ার ফলে দেশে নবায়নযোগ্য শক্তি খাতের বিকাশ ত্বরান্বিত হবে। এই খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ হ্রাস পাবে, যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। উপরন্তু, দেশের কার্বন নিঃসরণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। যা বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
তবে নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনে কর অবকাশ বাস্তবায়ন করতে গেলে কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। প্রথমতঃ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে যেন কর অবকাশের সুবিধা শুধুমাত্র প্রকৃত বিনিয়োগকারীরাই পায় এবং এটি অপব্যবহারের সুযোগ না থাকে। দ্বিতীয়তঃ বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নের সুবিধাজনক অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে দক্ষতার সাথে কাজ করতে হবে।
নবায়নযোগ্য শক্তির গুরুত্ব ও কর অবকাশ:
পরিবেশবান্ধব, কম কার্বন নিঃসরণকারী এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য ব্যবহারের উপযোগী হওয়ায় নবায়নযোগ্য শক্তিকে ক্লিন এনার্জি বা সবুজ শক্তি বলা হয়। এই শক্তির উৎসগুলির ব্যবহার বাড়ালে পরিবেশ দূষণ কমে আসবে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশ আরও একধাপ এগিয়ে যাবে। নবায়নযোগ্য শক্তির সাধারণতঃ কার্বন নিঃসরণ অত্যন্ত কম, ফলে এটি পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে কর অবকাশ একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ নীতি সহায়তা এবং বিনিয়োগকারীদের কর অবকাশ সুবিধা প্রদান করলে নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। এতে শুধু পরিবেশের উপকার হবে না, বরং অর্থনীতির জন্যও এটি একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করবে।
নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনে কর অবকাশ সুবিধা দেশের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এখনই এই শক্তির গুরুত্ব বোঝা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এর ফলে বাংলাদেশ শুধু পরিবেশবান্ধব ও উন্নত বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে অগ্রগতি অর্জন করবে না, বরং এই খাতের বিস্তারের মাধ্যমে জলবায়ুর পরিবর্তন রোধ, কার্বন নিঃসরণ কমাতে এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে অর্জনের আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

