বাংলাদেশের অর্থনীতি গত কয়েক দশকে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়েছে। কৃষি নির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্প ও সেবাখাতে রূপান্তরের এই প্রক্রিয়াটি দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে গতি এনে দিয়েছে। অর্থনীতির এই রূপান্তর কেবল কর্মসংস্থান বাড়ায়নি; বরং জাতীয় আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ সুগম করেছে। বর্তমান অর্থনীতির এই চিত্র কেবল দেশীয় প্রয়োজন মেটাচ্ছে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের জন্য একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করছে। এই পরিবর্তন যেমন নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি কৃষি ও শিল্প খাতের ভারসাম্য রক্ষা করাও আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
কৃষি খাতের অবনমন:
স্বাধীনতার পর ১৯৭০-এর দশকে বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ৬০ শতাংশ অবদান ছিল কৃষির। ধান, পাট ও অন্যান্য ফসলের উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের বেশিরভাগ মানুষের জীবিকা নির্ভর করতো। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে কৃষির অবদান ক্রমেই কমে আসছে। বর্তমানে এটি জিডিপির মাত্র ১১.৩৮ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। যদিও এখনো দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪০% কৃষি খাতেই কাজ করে, তবে এ খাতে কর্মসংস্থানের হার ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে।
১৯৭১ পর বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশ ছিল। ধান, পাট এবং অন্যান্য ফসল উৎপাদন দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৭০% পূরণ করত। যদিও কৃষি খাত এখনও দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তবে এটি এখন আর প্রধান চালিকাশক্তি নয়। সাম্প্রতিক সময়ে জমির সংকোচন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঠিক ব্যবহার এবং দক্ষ কৃষকদের প্রশিক্ষণের অভাবও কৃষির বিকাশকে সীমিত করে রেখেছে।
কৃষি খাত-চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার দিক:
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শিল্প ও কৃষি খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই খাতগুলোতে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মাস্টারকার্ড ইকোনমিক ইনস্টিটিউট (এমইআই) জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৫.৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা গত বছরের তুলনায় নিম্নগামী প্রবণতা নির্দেশ করছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে শিল্প খাতের জিডিপি ১৯ বেসিস পয়েন্ট কমে ৮.৩৭ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। এ হার সংকটকালীন পরিস্থিতির প্রতিফলন, যা শিল্পের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, কৃষি খাতে বিগত ১৫ বছরে অবদানের হার ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকের আয় কমছে, যা দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ।
কৃষি উৎপাদনে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিগত সরকার ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। কৃষকের উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর দীর্ঘমেয়াদী সুফল নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এখন দরকার শিল্প ও কৃষি খাতে সমন্বিত পরিকল্পনা। যাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ ও প্রবৃদ্ধি হার ধরে রাখা সম্ভব হয়।
শিল্পায়নের অগ্রগতি:
পোশাক শিল্পের মাধ্যমে শিল্পায়নের সূচনা ঘটে।বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর মধ্যে পোশাক শিল্প সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এই শিল্পের ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয় উনবিংশ শতাব্দীতে। যখন ১৮৩১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে প্রথম তৈরি পোশাক কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁত, তুলা ও সেলাই প্রযুক্তির উন্নয়নের মাধ্যমে এই খাত আরও প্রসারিত হয়, যা শিল্পায়নের নতুন দ্বার উন্মোচন করে।
বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের সূচনা হয় ষাটের দশকে, তবে তা রপ্তানিমুখী খাত হিসেবে বিকশিত হতে থাকে সত্তরের দশকের শেষের দিকে। এ শিল্প এখন দেশের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থান ও রপ্তানিমুখী খাত হিসেবে পরিচিত। যা আমাদের অর্থনীতির চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে।
বর্তমানে এই শিল্পটি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশি পোশাক শিল্প প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও মান বজায় রাখতে প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছে। দেশের জিডিপিতে তৈরি পোশাক শিল্প, চামড়া, ঔষধ শিল্প, ও জাহাজ নির্মাণ শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শহরে ও গ্রামাঞ্চলে নতুন নতুন শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠা হওয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে, বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থান, জীবনমানের উন্নতি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে।
রেমিট্যান্সের অবদান:
বর্তমান বাংলাদেশে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ভূমিকা অপরিসীম। এটি দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, রেমিট্যান্সের মাধ্যমে অর্জিত অর্থের প্রায় ৬৩ শতাংশ দৈনন্দিন খরচে ব্যয় হয়, যা প্রবাসী আয়ের প্রত্যক্ষ প্রভাবের একটি উদাহরণ। রেমিট্যান্স পাওয়ার ফলে একটি পরিবারের আয় আগের তুলনায় প্রায় ৮২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, যা সরাসরি তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সহায়ক। রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতির ৬ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখছে। যা দেশের দারিদ্র্য নিরসন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশের চলতি হিসাবে ভারসাম্য রক্ষা ও মুদ্রার মান স্থিতিশীল রাখা সহজ হচ্ছে। এছাড়াও প্রবাসী আয়ের ফলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
রেমিট্যান্স বাড়াতে সরকার প্রণোদনামূলক বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রতিটি রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে ২.৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রণোদনা প্রদান, ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের সম্প্রসারণের মতো কার্যক্রম দেশীয় অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অবদানকে আরও কার্যকর করছে। প্রবাসীরা সহজে ও দ্রুত অর্থ পাঠাতে পারায় এতে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো আরও শক্তিশালী হচ্ছে। একই সাথে দেশ কৃষিমুখী হওয়ার এককেন্দ্রীকতা থেকে ধীরে ধীরে বিকেন্দ্রীকরণকৃত হচ্ছে এবং শিল্পায়নসহ অন্যান্য খাতের দিকে ধীরে ধীরে ধাবিত হচ্ছে যা খুবই আশাব্যঞ্জক।
কৃষি থেকে শিল্পের দিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির এই রূপান্তর একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। সামগ্রিকভাবে, দেশের অর্থনীতি একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করছে যা টেকসই উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করেছে। উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতা রক্ষায় প্রয়োজন যুগোপযোগী নীতি ও সমন্বিত পরিকল্পনা। সরকারের উদ্যোগ এবং জনগণের সহযোগিতায় বাংলাদেশের অর্থনীতির এই রূপান্তর একসময় উন্নত অর্থনীতির স্বপ্ন পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

