দুই সপ্তাহব্যাপী টানটান দর-কষাকষির পর জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ ২৯ শেষ হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির মাধ্যমে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে বার্ষিক ৩০ হাজার কোটি ডলার অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি এসেছে, যা ২০৩৫ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে, এই প্রতিশ্রুতির অঙ্ক নিয়ে সমালোচনা এবং হতাশাও প্রকাশ করেছেন অনেকেই।
চুক্তি অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং অভিযোজন ব্যয় মেটাতে সরকারি ও বেসরকারি উভয় তহবিল মিলিয়ে একটি বিস্তৃত কাঠামো তৈরি করা হবে। এর লক্ষ্য বার্ষিক এক দশমিক তিন ট্রিলিয়ন ডলারের জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করা। যদিও তহবিলের এই পরিমাণ উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রত্যাশার তুলনায় কম, জাতিসংঘের জলবায়ু প্রধান সায়মন স্টিল এটিকে “মানবতার জন্য একটি বীমা” হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সম্মেলনের টানাপোড়েন এবং সমঝোতায় পৌঁছানো-
বৃহস্পতিবার শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আলোচনা দীর্ঘায়িত হয় শনিবার পর্যন্ত। উন্নয়নশীল এবং ছোট দ্বীপদেশগুলোর হতাশা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তারা সম্মেলন থেকে ওয়াকআউট করেন। তাদের অভিযোগ, জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী কিছু দেশ চুক্তির ভাষা দুর্বল করার চেষ্টা চালাচ্ছিল।
এর আগে, ২০২০ সালের মধ্যে দরিদ্র দেশগুলোর জন্য ১০ হাজার কোটি ডলার তহবিল দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল উন্নত দেশগুলো, যা বাস্তবায়িত হয় ২০২২ সালে। তবে সেই প্রতিশ্রুতির তুলনায় এবারের চুক্তি অর্থের পরিমাণ বাড়ালেও তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন অনেকে।
জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক এক পোস্টে জানিয়েছেন, “কিছু দেশের বাধার কারণে এই চুক্তি যথেষ্ট উচ্চাভিলাষী হয়নি। তবে যারা ন্যায্যতার বিরুদ্ধে ছিলেন, তারা হেরে গেছেন।” তিনি আরও বলেন, “এই তহবিল একটি সূচনা মাত্র। আমাদের ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অতীতের সমাধান দিয়ে চলবে না।”
উন্নয়নশীল দেশগুলোর হতাশা এবং বিরোধিতা-
ভারতের প্রতিনিধি চাঁদনি রায়না চুক্তির প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “এটি একটি বিভ্রম ছাড়া আর কিছু নয়। উন্নত দেশগুলোর স্পষ্ট অনাগ্রহ প্রমাণ করে যে, তারা তাদের দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত নয়।” তিনি এবং বেশ কয়েকটি এশিয়ান দেশ এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
অন্যদিকে, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জোট এলডিসির প্রধান মালাওয়ির কূটনীতিকের মতে, “আমরা আর উচ্চাভিলাষী হওয়ার অবস্থানে নেই। বহু বছরের আলোচনার পর এই চুক্তি নির্মাণের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।”
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা-
ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু কমিশনার ভপকে হুকস্ট্রা বলেন, “তহবিলের অঙ্ক ট্রিলিয়ন ডলার না হলেও এটি একটি প্রথম পদক্ষেপ। আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, এই কাঠামো এক দশমিক তিন ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সহায়ক হবে।”
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসও চুক্তিকে ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আমি আরও উচ্চাভিলাষী ফলাফল আশা করেছিলাম। তবে এই চুক্তি আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখাচ্ছে। এখন দরকার প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত নগদায়ন এবং সময়মতো বাস্তবায়ন।”
কপ ২৯-এর এই চুক্তি অনেক বিতর্কের জন্ম দিলেও, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি নতুন দিক উন্মোচন করেছে। যদিও অর্থায়নের অঙ্ক এবং প্রতিশ্রুতির পরিমাণ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে, তবুও এটি বৈশ্বিক উষ্ণায়ণ মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিশ্রুত অর্থ সময়মতো সরবরাহ এবং তা যথাযথভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করা।

