করোনার আগেও বাংলাদেশে বেবি ডায়াপারের বাজারের ৪০-৪৫ শতাংশ বিদেশি ব্র্যান্ডের দখলে ছিল। এখন তা কমে ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। তার মানে বর্তমানে বেবি ডায়াপারের প্রায় ৯০ শতাংশ বাজার দেশি কোম্পানির হাতে। আমদানিনির্ভরতা কমায় বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হচ্ছে। যদিও কাঁচামালের প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হয়। অন্যদিকে কয়েক বছর ধরে ২৫-৩০ শতাংশ হারে ডায়াপারের বাজার বড় হচ্ছে। ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগও আসছে এ খাতে।
ওষুধ খাতের পাশাপাশি দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী বিনিয়োগ করায় ডায়াপারের বাজারে দেশি ব্র্যান্ডের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১০টি। সিলিকন করপোরেশনের চু চু ডায়াপার, এবি গ্রুপের থাই ডায়াপার, এসিআইয়ের স্যাভলন টুইংকেল, ইনসেপ্টার নিওকেয়ার, স্কয়ারের সুপারমম, বসুন্ধরার বেবি ডায়াপার, মেঘনা গ্রুপের হ্যাপি ন্যাপি, এসএমসির স্মাইল, প্রাণের কিডস্টার, আকিজের মাম মাম, ইউনিম্যাক্স ইন্ডাস্ট্রিজের অ্যাভোনি ইত্যাদি দেশি ব্র্যান্ড রয়েছে এই বাজারে। একটি ওষুধ কোম্পানি নতুন করে ডায়াপারের বাজারে আসার পরিকল্পনা করছে।
একাধিক দেশি কোম্পানির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাজারে দুই রকমের ডায়াপার পাওয়া যায়। সেগুলো হচ্ছে প্যান্ট ও বেল্ট ডায়াপার। তবে এই বাজারের সিংহভাগ প্যান্ট ডায়াপারের দখলে। শীত মৌসুমে ডায়াপারের ব্যবসা গ্রীষ্মকালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়। সব মিলিয়ে মাসে ১৬০-১৮০ কোটি টাকার ডায়াপার বিক্রি হয়। তাতে পণ্যটির বাজারের বার্ষিক আকার দাঁড়ায় ১ হাজার ৯২০ কোটি থেকে ২ হাজার ১৬০ কোটি টাকার।
জার্মানভিত্তিক পরিসংখ্যানবিষয়ক প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিস্টার তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে বেবি ডায়াপারের বাজার ৫৬ বিলিয়ন বা ৫ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের। চীন এই বাজারের ২১ দশমিক ৪২ শতাংশ দখলে রেখেছে। গড়ে বিশ্বে প্রতিটি শিশু ১ দশমিক ১ কেজি ডায়াপার ব্যবহার করছে। যদিও বাংলাদেশের শিশুদের ক্ষেত্রে এই গড় শূন্য দশমিক ৭ কেজি।
একাধিক দেশি কোম্পানির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা জানান, একসময় দেশে শুধু হাগিজ, মামিপোকোর মতো বিদেশি ব্র্যান্ডের ডায়াপার পাওয়া যেত। পুরান ঢাকার সিলিকন করপোরেশন প্রথম চু চু ডায়াপার বাজারে নিয়ে আসে। তারপর থাই, বসুন্ধরা, এসিআই; একের পর এক দেশি কোম্পানি এই পণ্য তৈরিতে বিনিয়োগ করতে থাকে। বেশির ভাগ কোম্পানি বাজারে এসেছে গত এক দশকে। বর্তমানে অভিজাত দোকানে হাতে গোনা কয়েকটি বিদেশি ব্র্যান্ডের ডায়াপারের দেখা মিললেও দেশি পণ্যই বেশি।
করোনার আগেও দেশে ডায়াপারের বাজারে দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের হিস্যা প্রায় কাছাকাছি ছিল। মহামারিতে বিধিনিষেধের কারণে আমদানি কম হওয়ায় দেশি ব্র্যান্ডের ব্যবসা তখন বেড়ে যায়। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ডলারের দাম বাড়তে থাকলে বিদেশি ব্র্যান্ডের ডায়াপারের দামও বাড়তে থাকে। এ সময়ে বিদেশি ব্র্যান্ডের ডায়াপারের দাম অনেকেরই হাতের নাগালের বাইরে চলে যায়। সেই সুযোগে দেশি ব্র্যান্ডগুলো নিজেদের অবস্থান পোক্ত করে। যদিও কাঁচামাল আমদানির খরচ বেড়েছে। তাই দেশি ব্র্যান্ডগুলোও ডায়াপারের দাম কিছুটা বাড়ায়।
ডায়াপারের বাজারে শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর একটি এসিআইয়ের স্যাভলন টুইংকেল ব্র্যান্ড। এসিআই টয়লেট্রিজের প্রধান ব্যবসা কর্মকর্তা (সিবিও) কামরুল হাসান বলেন, অনেকগুলো দেশি কোম্পানি আসায় বাজারে ডায়াপারের দাম কমেছে। ২০২২ সালে যখন ডলারের দাম ৮৫ থেকে বেড়ে ১০০ টাকা ছাড়িয়ে গেল, তখন সরকার আমদানি নিরুৎসাহিত করা শুরু করল। তারই অংশ হিসেবে আমদানির ঋণপত্র খুলতে শতভাগ মার্জিন বাধ্যতামূলক করা হয়। ফলে আমদানি করা ডায়াপারের দাম বেড়ে যায়। সেই সুযোগে দেশি কোম্পানিগুলোর বাজার হিস্যা বাড়ে।
রাশেদুল ইমাম আরও বলেন, ডায়াপারের সব কাঁচামালই আমদানি করতে হয়। আমদানি শুল্কের কারণে দাম বেড়ে যায়। শুল্ক কমানো হলে দাম কিছুটা হলেও কমবে। বিএসটিআইয়ের নির্ধারিত মান অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে বিএসটিআইয়ের লোগো-সংবলিত ডায়াপার কেনাবেচায় সবাই সচেতন হলে দেশীয় পণ্যের বাজার আরও বড় হবে।
এক ডজনের বেশি দেশি ব্র্যান্ড ডায়াপারের ব্যবসায় এলেও বাজারে ডায়াপারের দাম এখনো বেশি। ব্র্যান্ড ও শিশুর বয়সভেদে একেকটি ডায়াপারের দাম ১৬ থেকে ২৩ টাকা। উচ্চ মূল্যের জন্য কাঁচামাল আমদানিতে বাড়তি শুল্ককে দায়ী করছে দেশি কোম্পানিগুলো।
ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের হাইজিং ডিভিশনের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক (মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি ডিপার্টমেন্ট) রাশেদুল ইমাম বলেন, আগে ডায়াপারের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য নিয়ে ক্রেতাদের বিশ্বাস ও আস্থায় ঘাটতি ছিল। এখন দেশি কোম্পানিগুলো মানসম্মত ডায়াপার তৈরি করে ক্রেতাদের বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছে। ফলে দেশি কোম্পানিগুলোর বাজার হিস্যা বেড়েছে। দেশি উৎপাদন না থাকলে দু-তিন গুণ বেশি দামে আমদানি পণ্য কিনতে হতো।

