বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে।যেখানে তারুণ্যের অদম্য শক্তি বৈষম্যহীন দেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সংগ্রামে বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে একটি সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার নিয়ে।
এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা- যেখানে বৈষম্যহীন ভালো কাজ, উদ্ভাবন এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি সুস্পষ্ট। আপামর জনগণের সমর্থন এবং তরুণদের নেতৃত্ব আমাদের দেখিয়েছে যে সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রচেষ্টা কিভাবে সমাজকে পরিবর্তনের পথে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মতোই বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ বর্তমান সময়ে কর্মসংস্থানের সমস্যায় নিপতিত। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের মতো বিষয়গুলো এ চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করে তুলেছে। বর্তমান সময়ে তরুণদের জন্য টেকসই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সরকারের নীতিনির্ধারক, বেসরকারি খাত এবং সমাজের সবার জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বাংলাদেশের উন্নয়নের চালিকাশক্তি হলো তার বিশাল তরুণ জনশক্তি। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০% তরুণ। তবে এই বিশাল শক্তি বেকারত্ব ও দক্ষতার অভাবে পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারছে না। একবিংশ শতাব্দীর দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা সময়ের দাবি। তরুণদের জন্য টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা কেবল অর্থনৈতিক বিকাশের উপাদান নয়, বরং সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম শর্ত।
তরুণদের বর্তমান চিত্র:
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১৭ কোটি ১৫ লাখ ৯০ হাজার। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ১৫ লাখ। কিন্তু এ বিশাল তরুণশক্তির মধ্যে প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ তরুণ কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে। অর্থনীতির ভাষায় এ অবস্থাকে বলা হয় NEET (Not in Employment, Education and Training)।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ তরুণের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র বা প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সঙ্গে সংযুক্তি নেই। এই বাস্তবতা শুধু ব্যক্তি বা পরিবার নয়, পুরো জাতির জন্যই উদ্বেগের কারণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৪২ শতাংশ তরুণ বেকারত্ব নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত। বেকারত্বের এই চাপ তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যেও প্রভাব ফেলছে। দৈনিক শিক্ষা ডটকমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের তরুণদের ৭৫ দশমিক ৯ শতাংশই বিষণ্নতায় ভুগছে। বেকারত্ব এবং মানসিক চাপের এই যুগল সংকট তরুণদের সৃজনশীলতা, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ধ্বংস করে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই প্রবণতা জাতীয় উন্নয়নের গতিকে মন্থর করে দিবে।
তরুণদের কর্মসংস্থানে বাধা:
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম আজ যে সমস্যার মুখোমুখি তা কেবল তাদেরই নয়, পুরো দেশের অগ্রগতির গতিকেও প্রভাবিত করছে। তরুণদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় সমস্যা দেখা যায়। যেমন: বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং চাকরির বাজারের চাহিদার মধ্যে একটি বড় ফাঁক রয়েছে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় দক্ষতার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে কম। ফলে তরুণরা চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের শেখানো হয় তাত্ত্বিক জ্ঞান, যা বাস্তব জীবনের সমস্যাগুলোর সমাধানে কার্যকর নয়।
বিশ্ব দ্রুত প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে উঠছে। অথচ, বাংলাদেশে প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। ফলে, তরুণরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাজ করতে পিছিয়ে পড়ছে। ডিজিটাল অর্থনীতি এবং আইটি খাতে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, এই খাতে দক্ষ কর্মীর অভাব একটি বড় প্রতিবন্ধকতা।
তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা বাড়লেও সঠিক দিকনির্দেশনা, সহায়ক পরিবেশ এবং অর্থায়নের অভাবে তারা পিছিয়ে পড়ছে। সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়া, আইনি জটিলতা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণের অভাব অনেকের উদ্যোগকে থামিয়ে দিচ্ছে।
এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন। শিক্ষাব্যবস্থাকে দক্ষতাভিত্তিক করে তোলা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ সহজলভ্য করা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য আর্থিক সহায়তা ও পরামর্শদাতা নেটওয়ার্ক তৈরি করা জরুরি। তরুণদের উন্নয়ন মানে সমাজের তথা দেশের ভবিষ্যৎ শক্তিশালী করা। এই সংকট দূর করার জন্য সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। কর্মমুখী প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি-নির্ভর শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা বান্ধব নীতি বাস্তবায়ন করলে তরুণরা আবারও জাতির অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।
তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান গড়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা:
বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের প্রধান বাধা হলো তরুণদের কর্মসংস্থান। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
তরুণদের উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করা গেলে কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। এজন্য ব্যবসা শুরু করার ক্ষেত্রে সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং পরামর্শ প্রদান করা প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা বাড়ানো গেলে কর্মসংস্থানের অভাব অনেকটাই কমে যাবে। নারী ও যুবকদের ক্ষমতায়নের জন্য প্রথাগত সীমাবদ্ধতা ভেঙে নতুন নীতিমালা প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি যুবকদের দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে গ্রামীণ ও শহুরে এলাকার বৈষম্য কমিয়ে এনে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে।
তরুণদের কর্মমুখী করতে তাদের দক্ষতা উন্নয়নে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের মধ্যে কর্মজীবন সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি করা জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণরা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে। গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থানের অভাব বেশি। তরুণরা শহরে পাড়ি জমালেও সেখানে পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় বেকার থেকে যায়। গ্রামাঞ্চলে শিল্প-কারখানা স্থাপন এবং স্থানীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করলে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
এই সংকট সমাধানে সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম এবং উদ্ভাবনী স্টার্টআপ প্রজেক্টের সংখ্যা বাড়ানো গেলে তরুণরা দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বেকার তরুণদের প্রশিক্ষণ, কারিগরি শিক্ষার সুযোগ এবং স্টার্টআপে বিনিয়োগের মাধ্যমে তাদের কর্মমুখী করা সম্ভব। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা শুধু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নয়, একটি সুশৃঙ্খল ও সুস্থ সমাজ গড়ার পূর্বশর্ত।
সরকারের উচিত কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি-নির্ভর শিক্ষা এবং ন্যায্য সুযোগ তৈরিতে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া।
তারুণ্যের জাগরণ শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বৈশ্বিক ক্ষেত্রেও একটি প্রেরণা হয়ে উঠতে পারে। তবে এই জাগরণের সুর ধরে রাখতে হলে সমষ্টিগত প্রচেষ্টা, দৃষ্টিভঙ্গির উদারতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ অপরিহার্য।
আমাদের স্বপ্নের সমৃদ্ধশালী সোনার বাংলাদেশ গড়তে হলে, তরুণদের স্বপ্নকে প্রাধান্য দিয়ে, তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার সময় এসেছে। কারণ- এই দেশকে সত্যিকার অর্থে বদলানোর ক্ষমতা তাদের হাতেই। তরুণ প্রজন্ম বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই সম্পদকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে কৌশলগত পরিকল্পনা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বহুমুখী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একদিকে প্রযুক্তি, অন্যদিকে সৃজনশীলতা- এই দুইয়ের সমন্বয়ে তরুণদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব।
যেখানে তরুণেরা উন্নয়নের প্রধান চালিকা শক্তি, সেখানে কর্মসংস্থানের সংকট সমাধানে আমাদের এখনই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তাদের উদ্যম, শক্তি ও মেধাকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারলে- বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছাবে আশা করা যায়।

