বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের ছোঁয়ায় দ্রুত রূপান্তরিত হচ্ছে। একদিকে উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত উন্নতি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে; অন্যদিকে প্রচলিত অনেক পেশার অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই পরিবর্তন শুধু কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেই নয় বরং সমাজ ও অর্থনীতির সামগ্রিক কাঠামোতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। এই পরিবর্তন শুধু চাকরির সংখ্যা নয় বরং প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং কর্মক্ষেত্রের প্রকৃতি নিয়েও নতুন ভাবনার জন্ম দিচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বর্তমান চাকরির বাজারের এক-চতুর্থাংশ আমূল পরিবর্তনের মুখোমুখি হবে। এর পেছনে মূলতঃ দুটি কারণ কাজ করছে- প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং সবুজ ও টেকসই অর্থনীতির দিকে বিশ্বব্যাপী দৃষ্টি। বাংলাদেশের চাকরিবাজারেও এই পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়বে। আমাদের দেশে এখনও শ্রমনির্ভর খাতের ওপর প্রচুর নির্ভরতা থাকলেও, প্রযুক্তি-নির্ভর অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে। তথ্যপ্রযুক্তি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই), ডেটা অ্যানালিটিকসের মতো ক্ষেত্রগুলোতে দক্ষ পেশাজীবীর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
প্রযুক্তির উন্নতি ও নতুন কাজের সুযোগ:
বাংলাদেশে চাকরি বাজারের পরিবর্তনে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে উত্তরণের পথে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাত এখন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত। যদিও গত এক দশকে এই খাতের প্রভূত সম্ভাবনার কথা আলোচিত হয়েছে। তবে অতীত সরকারের উদাসীনতা ও অদূরদর্শী নীতিমালার কারণে এই খাত কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি থেকে পিছিয়ে পড়েছিল
২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের রপ্তানি আয় কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ কোটি ৭০ লাখ ডলারে- যা স্পষ্টতই একটি হতাশাজনক চিত্র। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, সেবামূলক রপ্তানির মাত্র ১০ শতাংশই এখন আইসিটি খাত থেকে আসে। তবে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার এই খাত পুনর্গঠনের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে আইসিটি খাতে বরাদ্দ ৪৯০ কোটি টাকা বৃদ্ধি, ফ্রিল্যান্সিং খাতের সম্প্রসারণ এবং নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে আইটি খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে।
ফ্রিল্যান্সিং খাতে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। রেমিট্যান্সের বড় একটি অংশ এখন ফ্রিল্যান্সারদের মাধ্যমে আসছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবাসী আয় ২৩.৯১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১০.৬৬ শতাংশ বেশি। প্রবাসীদের পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সারদের এই অর্জন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে বড় ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশে চাকরি বাজারের পরিবর্তনে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সিং খাত এ পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সার নিয়োগে বাংলাদেশ ২৯তম অবস্থানে রয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে অবস্থান করছে। তবে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের অবদান অনলাইনে আউটসোর্সিং বাজারে ১৬ শতাংশ, যা একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।
বিশ্বব্যাপী ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মের বাজারের আকার এখন ৩.৩৯ বিলিয়ন ডলার, যেখানে প্রায় ১৫৭ কোটি ফ্রিল্যান্সার কাজ করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশি ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন, যাদের মধ্যে ৬ লাখ ৫০ হাজার আইটি খাতে কাজ করছেন। ডিজিটাল মার্কেটিং, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, গ্রাফিক্স ডিজাইন এবং কনটেন্ট রাইটিং বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতে সবচেয়ে জনপ্রিয় কাজের মধ্যে অন্যতম।
ডব্লিউটিও-এর “ওয়ার্ল্ড ট্রেড রিপোর্ট ২০২৩”- এর তথ্যমতে, বর্তমান বৈশ্বিক সংকট সত্ত্বেও, ডিজিটাল মাধ্যমের ওপর নির্ভর করেই ব্যবসা-বাণিজ্যকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার চেষ্টা চলছে। এই প্রেক্ষাপটে ফ্রিল্যান্সিংকে বলা যেতে পারে আইটি খাতের এক “অদৃশ্য নায়ক”। উদাহরণ স্বরূপ- পাঠাও এবং শপআপ এর মতো স্টার্টআপগুলো শুধুমাত্র কর্মসংস্থানই তৈরি করেনি, চাকরি বাজারের পুরনো নিয়ম ভেঙে নতুন দিশা দেখাচ্ছে। এছাড়া ই-কমার্সের বিস্তারে হাজার হাজার মানুষ নতুন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।
কৃষি খাতে প্রযুক্তির ব্যবহারও কর্মসংস্থানে নতুন মাত্রা যোগ করছে। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি বাংলাদেশের কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি যেমন: কৃষি রোবট, ড্রোন, চালকবিহীন ট্রাক্টর, নির্ভুল কৃষি প্রযুক্তি ও কৃষি উৎপাদন বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছে। জমি চাষ, সার প্রয়োগ ও আগাছা দমনসহ নানা কাজে যন্ত্রের ব্যবহার কৃষি কাজকে করেছে অধিকতর কার্যকর।
তবে এর পাশাপাশি একটি বাস্তবতা হলো, এই প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কর্মসংস্থানে সংকট -বিশেষ করে কৃষি প্রক্রিয়াকরণ ও মাঠপর্যায়ের কাজে মানুষের চাহিদা কমছে। তারপরও উৎপাদন বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের কৃষি খাতে প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে উৎপাদনশীলতা যেমন বাড়ছে, তেমনি উদ্ভাবনের এই ধারা দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে প্রযুক্তিগত উন্নতির পাশাপাশি কিছু প্রতিবন্ধকতা ও রয়েছে। যেমন: বাংলাদেশে চাকরি প্রার্থীদের মধ্যে প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ইউনিসেফের একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার অর্ধেক তরুণ কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে আছে। বিশেষ করে ডিজিটাল এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রার্থী চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে। তবে এখনো ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দক্ষতার এই ঘাটতি পূরণে ব্যাপক কাজ বাকি ।
গার্মেন্টস শিল্পে রোবটিক প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। বিশেষতঃ উন্নত দেশে অটোমেশন এবং রোবটিক সেলাই যন্ত্রপাতির ব্যবহার শ্রম খরচ কমাতে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই প্রযুক্তি বাংলাদেশের মতো শ্রম-নির্ভর শিল্পে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে। বর্তমান যুগে প্রযুক্তির উন্নয়ন অনেক পেশায় উচ্চ আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু একইসঙ্গে শ্রমনির্ভর পেশাগুলোর আয় স্থির হয়ে গেছে, এমনকি কখনও কখনও কমেও যাচ্ছে। এই বৈষম্য সমাজে অর্থনৈতিক ফারাক আরও গভীর করছে।
নতুনত্বের আগমন:
প্রযুক্তির উদ্ভাবন বাংলাদেশের চাকরি বাজারকে নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিয়েছে। স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড এবং সরকারের অন্যান্য প্রকল্পগুলো তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। তবে এই ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় তহবিল এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে অনেক স্টার্টআপ টিকে থাকতে পারছে না।
এছাড়া শিক্ষায় উদ্ভাবনী চিন্তাধারার অভাব তরুণদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো STEM ( Science, Technology, Engineering and Mathematics) শিক্ষার ওপর প্রচুর গুরুত্ব দিচ্ছে। এই শিক্ষাব্যবস্থা কর্মসংস্থান এবং উদ্ভাবনে নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে STEM শিক্ষার প্রসার এখনো তেমনভাবে কার্যকর হয়নি।
কীভাবে আমরা এগিয়ে যাব? বাংলাদেশের চাকরি বাজারে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ইতিবাচক প্রভাব বাড়াতে হলে কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে- প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনভিত্তিক শিক্ষার প্রসার জরুরি। STEM শিক্ষায় বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য একবিংশ শতাব্দীতে একটি সুদূরপ্রসারী লাভের পথ হতে পারে। তাই সরকারের পাশাপাশি কর্মশালা, প্রতিযোগিতা এবং প্রচারণার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের STEM বিষয়ে আগ্রহী করা প্রয়োজন। বেকার ও চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং পুনঃপ্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলোকে আর্থিক ও প্রশাসনিক সহায়তা দিয়ে টেকসই করা প্রয়োজন। শ্রমিকদের জন্য বিকল্প দক্ষতা শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে, যেন তারা চাকরির বাজারে টিকে থাকতে পারে।
বাংলাদেশের চাকরি বাজারে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের প্রভাব অত্যন্ত গভীর এবং সম্ভাবনাময়। প্রযুক্তির অগ্রগতি যেমন কাজের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়িয়েছে, তেমনি অনেক ঐতিহ্যবাহী কাজের ধরনকে পরিবর্তন করেছে। উদ্ভাবনী সমাধানগুলো নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে- বিশেষতঃ তথ্যপ্রযুক্তি খাতে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নিজেদের দক্ষতাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা। শুধুমাত্র একাডেমিক সাফল্যের উপর নির্ভরশীল না থেকে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী দক্ষতা অর্জনে মনোযোগী হতে হবে।
নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিল্প খাতকে একত্রে কাজ করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় কারিগরি ও প্রযুক্তি নির্ভর কোর্স অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারবে।

