ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের কথা উঠলে আমাদের মাথায় আসে, অনেক মানুষ ঋণ নিয়ে শোধ করছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টের তথ্য বলছে ছবিটা প্রায় উল্টো।
২০২৫ সালের শেষে ব্যাংক খাতের মোট ঋণ ছিল ১৮ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি, এর মধ্যে খেলাপি ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা মোট ঋণের ৩০.৬০ শতাংশ। এক বছর আগে এই হার ছিল ২০.২০ শতাংশ। অথচ দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্যক্তিগত ঋণ, আবাসন ঋণ, ক্রেডিট কার্ড ও গাড়ি ঋণ মিলিয়ে ভোক্তা ঋণের খেলাপি মাত্র ৯ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা। তাহলে আপনার আমার কিস্তির চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, খেলাপির বাকি প্রায় ৯৮ শতাংশ কোথায় আছে?
সবচেয়ে বেশি ঋণ একখাতে, সবচেয়ে বেশি খেলাপি আরেকখাতে
২০২৫ সালের শেষে ‘Consumer Credit’ এর প্রতিবেদনে ভোক্তা ঋণের খাতগুলোর আলাদা আলাদা চিত্র উঠে এসেছে।
ব্যক্তিগত ঋণের বকেয়া ছিল ৭০ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা, যার খেলাপি ৫.৭০ শতাংশ।
আবাসন ঋণের বকেয়া ৩৬ হাজার ১৪০ কোটি টাকা, কিন্তু খেলাপির হার ১৩.১০ শতাংশ।
ক্রেডিট কার্ডে বকেয়া ১২ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা ও খেলাপি ৭.৭৬ শতাংশ, আর গাড়ি ঋণে বকেয়া ৪ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা ও খেলাপি ৪.২৫ শতাংশ।
আবাসন ঋণের হিসাবটি আমি আলাদাভাবে মিলিয়ে দেখেছি। প্রতিবেদন অনুযায়ী ভোক্তা ঋণের আওতায় আবাসন ঋণ ৩৬ হাজার ১৪০ কোটি টাকার মতো, যার ৪ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা খেলাপি, হার ১৩.১ শতাংশ।
মজার বিষয় হলো, ব্যক্তিগত ঋণ আবাসন ঋণের প্রায় দ্বিগুণ হলেও খেলাপির অঙ্কে আবাসন ঋণ এগিয়ে, ৪ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা বনাম ৪ হাজার ৪২ কোটি টাকা। ভোক্তা ঋণের মোট খেলাপির প্রায় ৪৭.৫ শতাংশ আসছে আবাসন থেকে, আর ব্যক্তিগত ঋণ থেকে ৪০.৬ শতাংশ। একটা সতর্কতা অবশ্য জরুরি।
আবাসন ঋণে হার বেশি কেন
আবাসন ঋণ সাধারণত দীর্ঘ মেয়াদের, কিস্তিও বড়। তার সাথে কোনো স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা,জামানতের অপর্যাপ্ততা,স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ দেওয়া হয়।এর মধ্যে চাকরি হারানো, আয় কমে যাওয়া বা বড় চিকিৎসা খরচ এলে কিস্তির হিসাব সহজেই এলোমেলো হয়ে যায়। আর বাড়ি বা ফ্ল্যাটের দাম থাকলেও জরুরি অবস্থায় দ্রুত বিক্রি করা যায় না, ফলে ব্যাংকের আদায়ও সময়সাপেক্ষ হয়।
এগুলো সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধরা হয়, যুক্তিভিত্তিক প্রমাণ নয়, কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই তথ্যে খেলাপির কারণের আলাদা ব্যাখ্যা নেই।
ডেইলি স্টারের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন নিয়মে মেয়াদি ঋণ খেলাপি ধরার সময়সীমা ছয় মাস থেকে কমিয়ে তিন মাস করা হয়েছে। অর্থাৎ,পূর্বে সময়সীমা বাড়িয়ে দিয়ে ঋণখেলাপিদেরকে সাধারণ ঋণের আওতায় নিয়ে আসা যেত কিন্তু তা এখন হিসাবে আসছে।
এবার বড় খাতের দিকে দেখা যাক, ব্যাংকের মোট ঋণের ৫১.৩৫ শতাংশ গেছে শিল্প উৎপাদন খাতে, আর মোট খেলাপির ৪৮.৫১ শতাংশ এ খাতেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে ঋণ মোটের ১৮.১৬ শতাংশ, কিন্তু মোট খেলাপির ২৯.৫৯ শতাংশ, এই খাতে খেলাপির হার প্রায় ৪৫.৬ শতাংশ।
শীর্ষ ৫০ বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণ ও খেলাপি দুটোই বেড়েছে। আর ব্যাংকগুলোর টিকে থাকার পরীক্ষায় দেখা গেছে, খেলাপি বাড়লে মূলধনের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত আসে, তারপরে আসে প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ দুই ঋণগ্রহীতার খেলাপি হয়ে যাওয়া।
কয়েকজনের ঋণ বনাম হাজারো মানুষের কিস্তি
এখানে ব্যাংকিংয়ের একটি পুরোনো নীতি কাজ করে অর্থাৎ ঝুঁকি ছড়িয়ে দিলে ব্যাংক নিরাপদ থাকে, কেন্দ্রীভূত করলে বিপদ বাড়ে। হাজারো মানুষকে ছোট ছোট অঙ্কে ঋণ দিলে কয়েকজনের খেলাপি পুরো ব্যাংকের ওপর বড় চাপ ফেলে না। কিন্তু অল্প কয়েকজনকে বিশাল অঙ্কের ঋণ দিলে একজনের ব্যর্থতাই ব্যাংকের মূলধন নাড়িয়ে দিতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণে খেলাপির হার ছিল ১৫.২ শতাংশ, ১ থেকে ১০ কোটি টাকার ঋণে ২৭.৯ শতাংশ, ১০ থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণে ৪৮.১ শতাংশ, আর ৫০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণে ৫১ শতাংশ।
ঋণ যত বড়, খেলাপির হার তত চড়া।
কিন্তু ছোট ঋণ কি পুরোপুরি নিরাপদ
এখানেও একটা সতর্কবার্তা। ভোক্তা ঋণ তুলনামূলক নিরাপদ বলে এর দিকে ঝুঁকে পড়াও ঝুঁকিহীন নয়।
টিবিএসের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৫ সালের জুনে ভোক্তা ঋণ বছরওয়ারি ২৬ শতাংশ বেড়েছিল, যেখানে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে মোট ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৮ শতাংশ।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবাসন ঋণের সর্বোচ্চ সীমা ২ কোটি থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত করেছে। সাম্প্রতিক এক সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত ঋণ পরিশোধের সর্বোচ্চ মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে আট বছর করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো খুচরা ঋণে ফিরলে ঝুঁকি ছড়াবে এবং সাধারণ মানুষের ঋণপ্রাপ্তি সহজ হবে। কিন্তু আবাসন ঋণে খেলাপির হার যেখানে ১৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে, সেখানে ঋণের সীমা ও মেয়াদ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিশোধ সক্ষমতা যাচাইও কড়া থাকা দরকার। আমার মূল্যায়নে এই যাচাইয়ের মানই ঠিক করবে, ভোক্তা ঋণ ব্যাংকের জন্য স্থিতিশীলতার উৎস হবে নাকি নতুন সংকটের।
পুরোনো হিসাবের পর নতুন চিত্র কী?
ভোক্তা, আবাসন, শিল্প ও বাণিজ্য খাতের যে তুলনা করা হলো, তা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের হিসাব। এরপর ব্যাংক খাতের সামগ্রিক খেলাপি ঋণ আরও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
সব মিলিয়ে, ব্যাংকঋণের ঝুঁকি বুঝতে শুধু কত টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে তা দেখলে চলবে না। কোন খাতে বকেয়া বেশি, কোথায় খেলাপির হার বেশি এবং মোট খেলাপি ঋণে কোন খাতের অবদান সবচেয়ে বেশি, এই তিনটি হিসাব আলাদা করে দেখতে হবে।তার পাশাপাশি আমরা ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে সমাধান করতে পারি।
- ঋণ দেওয়ার আগে কড়া যাচাই: ব্যবসার নগদ প্রবাহ ও পরিশোধ সক্ষমতা স্বাধীনভাবে দেখতে হবে, কারণ খেলাপি বাড়ার পেছনে রয়েছে অসতর্ক ঋণ বিতরণ ও দুর্বল তদারকি।
- লুকানো ঋণ প্রকাশ, ঢালাও পুনঃতফসিলে লাগাম: অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ, পুনঃতফসিল শুধু ব্যবসাক্ষম ঋণগ্রহীতার জন্য এবং কড়া শর্তে হওয়া উচিত।
- বড় ঋণের সীমা ব্যাংকের ঋণমানের সঙ্গে বাঁধা: একক গ্রাহকের সীমা ১৫ থেকে ২৫ শতাংশে বাড়ানোর পর নজরদারি আরও কড়া দরকার। আবাসন ঋণের মতো ঋণমান ভিত্তিক সীমা এখানেও প্রযোজ্য।
- ভোক্তা ঋণে সীমা বাড়ানোর সঙ্গে পরিশোধ যাচাইও বাড়ানো: আবাসন ঋণে খেলাপির হার ১৩.১ শতাংশ হওয়ায় আয়ের সঙ্গে কিস্তির অনুপাত খতিয়ে দেখা জরুরি।
নুয়াল আল যুগমী মৈত্রী
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)সিটিজেন্স ভয়েস

